সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি

কুন্তলার লেখার তারিফ করতে করতে সেদিন আমি আর আমার স্ত্রী একটা জিনিস আবার নতুন করে খেয়াল করলাম। ওর লেখার নান্দনিকতার একটা মেজর কারণ হোল ওর সৃজনশীলতা, বা ক্রিয়েটিভিটি – যার মাধ্যমে ওর চোখে সাধারণ জীবনের দৈনন্দিন ঘটনাগুলিও অসাধারণ হয়ে ধরা পড়ে, এবং এক্সপ্রেশন-এর গুণে অনন্য হয়ে ওঠে। আমার এক অতিপ্রিয় ভগিনীসমা বন্ধুরও এই গুণটি আছে – তার নাম শকুন্তলা, তার অশেষ গুণাবলীর কথা অন্য আরেকদিন ব্যাখ্যান করব না হয়, কিন্তু তার লেখার হাতটিও চমৎকার – যদিও এই মুহূর্তে আমার কাছে প্রমাণ চাইলে আমি অপারগ, কারণ বার বার করে ধাক্কানো সত্ত্বেও তিনি কিছুতেই একটা ব্লগ লেখা শুরু করছেন না, গজগজগজগজগজগজগজ। যাউকগ্যা, কিন্তু (শ)কুন্তলাদ্বয়ের লেখার এই একটা গুণ আমি খুব উপভোগ করে থাকি।

… নট টু মেন্‌শন, অফ কোর্স, হিংসায় জ্বলেপুড়েও যাই। ইস, আমি যদি এইরকম লিখতে পারতাম।

[দীর্ঘশ্বাস]

যাই হোক, ভাবতে ভাবতে হঠাৎ পুরোন স্কুলজীবনের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। পুরুলিয়ার একটা নাম করা আবাসিক বিদ্যালয়ে আমি ক্লাস এইট থেকে টেন, তিন বছর পড়েছি আর তারপর মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি। হোস্টেল-এ থাকতাম, এক দঙ্গল ছেলে; সাধারণভাবে প্রচণ্ড নিয়মের মধ্যে বাঁধাধরা জীবন – ওই ক্যারেক্টার বিল্ডিং আর কি – তবে তারই মধ্যে ওই কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন-এর বিল্ডিং-এর মতনই একটু আধটু বেনিয়মের উপভোগ্য ভেজাল ছিল বইকি। কয়েকটা ঘটনা মনে পড়ছে, এক এক করে বলছি।

ক্লাস টেন-এ উঠে যে হোস্টেলটাতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হোল, সেইটা স্কুল বিল্ডিং এর পাশেই। খুব মজা, হেঁটে পৌঁছতে তিন মিনিটও সময় লাগে না। এমনিতেই স্কুল ইউনিফর্ম-এর ডিসিপ্লিন-এর চাপে প্রাণ ওষ্ঠাগত – শাঞ্জাবী (হেমন্তবাবুর স্টাইলে) আকাশী নীল জামা, শার্টের মতন কলার এবং ফুলহাতার বোতাম, কিন্তু মাত্র তিন থাক বুকের বোতাম, তাই মাথা গলিয়ে পড়তে হয়; সাদা প্যান্ট, তাতে শাঞ্জাবীর নিচটা সুন্দর করে গোঁজা থাকতে হবে; নীল মোজা এবং কালো জুতো – এই সব পরে তবেই স্কুল বিল্ডিং-এ পদার্পণ, তাই সক্কাল সক্কাল ওই সময়ের সাশ্রয়টা বেশ আনন্দদায়ক ছিল। যাকগে, কিন্তু সেই প্রাইম লোকেশন-এর মুশকিল ছিল একটাই। দোতলা হোস্টেল বাড়িটার একতলায় একটা কোণার ঘর ছিল আমাদের চিফ ওয়ার্ডেন-এর ঘর। চিফ ওয়ার্ডেন বলে কথা, দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, বাধ্য হয়েই অনেকটা সেই আলিপুর সেন্ট্রাল জেল বা সান ফ্রান্সিসকোর উপকূলসকাশী আলকাত্রাজ-এর ওয়ার্ডেন-এর মত করে ভক্তিশ্রদ্ধা করতে হোত। সেই ভক্তির দৌলতে সেই ঘরটার পাশের ঘর এবং ঠিক ওপরের দোতলার ঘর, এই দুটো ঘরেই ছেলেদের থাকার ইচ্ছেটা বেশ দৃশ্যত ক্ষীণ হয়ে থাকত। কারণ সেই ঘরদুটোতে জোরে কথা বলা, হাসা বা তর্ক করা যেতনা, ঘরের মধ্যে খাট সরিয়ে রুম ক্রিকেট বা গামছা টাঙ্গিয়ে রুম ভলিবল খেলার প্রশ্নই নেই, অনেক রকমের বাধ্যবাধকতা। সৌভাগ্যক্রমে, দা পাওয়ার্স দ্যাট বী, অর্থাৎ আমাদের নিজস্ব ওয়ার্ডেনরা, সেটা বুঝতেন, এবং সেই কারণে ওই দুটো ঘরে এমন সব ছেলেদের থাকতে দেওয়া হোতো যারা পড়াশোনায় মনোযোগী, আপাতদৃষ্টিতে শান্তশিষ্ট, চুপচাপ, সাত-চড়ে-রা-কাড়ে না টাইপের। সেখানেও ভেতরে গল্প আছে, কিন্তু সে সব পরে বলব।

এরকমই দুজন ছিল – ধরা যাক তাদের নাম, প্রসূন আর রাজর্ষি – যাদের থাকতে দেওয়া হয়েছিল ওই দোতলার কোণার ঘরে, চিফ ওয়ার্ডেন-এর অফিসের ওপরে। দুজনেই শান্তপ্রকৃতির, তার মধ্যে প্রসূন ছিল সেই বয়সেই তালঢ্যাঙা এবং রোগা। এই প্রসঙ্গটা উত্থাপন করে রাখার একটা কারণ আছে, সময়ে প্রকাশ্য।

আরেকটা প্রয়োজনীয় তথ্য, ওই কোণার ঘরগুলোর ঠিক উল্টোদিকে একটা উইং থাকত, সেটা ছিল বাথরুম এবং চানের জায়গা। অনেকটা এই রকম –

Hostel Layout

এবার আরো দুটো প্রাসঙ্গিক তথ্য। এক, সপ্তাহের মধ্যে চারদিন আমরা সকালে চান করে ভাত খেয়ে স্কুলে যেতাম ন’টা নাগাদ, কিন্তু বুধবারটা ছিল আলাদা। বুধবার অনেক ভোরে ক্লাস থাকত, এবং দুপুরের মধ্যে ছুটি হয়ে যেত আর আমরা হোস্টেলে ফিরে আসতাম। তারপর চান করে ভাত খেয়ে অল্প বিশ্রাম নিয়ে পড়াশোনার সময় ছিল, স্টাডি হল-এ বসে। দুই, আমাদের ওয়ার্ডেন ছিলেন একজন দক্ষিণ ভারতীয় ভদ্রলোক, স্কুলে অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন এবং অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে খুব ভালই ছিলেন, কিন্তু ওয়ার্ডেন হিসেবে অত্যন্ত রাশভারী, কড়া, বদমেজাজী, এবং কারণে-অকারণে ছেলেদের মারধোর করার প্রবণতাসম্পন্ন। শুধু এইটুকু বলেই ক্ষান্ত দিচ্ছি – আমরা খুবই ভয়ে থাকতাম, পারতে কাছাকাছি ঘেঁষতাম না।

সেরকমই একটা বুধবারের কথা। আমরা ক্লাস থেকে ফিরে এসেছি, যে যেরকম পারছে চান সেরে নিচ্ছে – কারণ তারপর ডাইনিং হল-এ খাওয়ার ঘণ্টা বাজলে খেতে যাওয়া। আমার দু’তিনটে ঘর পরে প্রসূন-এর কোণার ঘর। সেদিন প্রসূন ক্লাস থেকে হেঁটে আসতে একটু দেরী করেছে কোন কারণে। কেউ কেউ জানতে পেরেছিল যে ঠিক সেই সময়ে আমাদের ওয়ার্ডেন গেছেন চিফ ওয়ার্ডেন-এর সঙ্গে দেখা করতে। আমাদের ঘরগুলোর দরজায় কোন তালা লাগানোর পারমিশন ছিল না, খোলাই থাকত। কয়েকজন মিলে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে প্রসূনের ঘরে ঢুকে বেশ মিনিট খানেক ধরে প্রচণ্ড লাফালাফি করেছে ধড়াম ধড়াম করে, জেনে শুনেই যে ঠিক তার নিচের ঘরে সেই সময়তেই ওয়ার্ডেন-চিফ ওয়ার্ডেন দু’জনেই বসে আছেন। লাফালাফি দাপাদাপি করে তারা যে যার মত চট করে বাথরুমে ঢুকে পড়েছে।

এদিকে যা হবার, ঠিক তাই হয়েছে। আমাদের ওয়ার্ডেন, সেই শব্দকল্পদ্রুমের চোটে প্রচণ্ড ক্ষেপে, চিফ ওয়ার্ডেন-এর ঘর থেকে বেরিয়ে হোস্টেল-এর দরজা দিয়ে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে কোণার ঘরে আসছেন দুম দুম করে; ওইটা একটা বাঁচোয়া ছিল, চিফ ওয়ার্ডেন-এর ঘরটার সঙ্গে আমাদের হোস্টেল-এর বাকি অংশের কোন যোগাযোগ ছিলনা। বাইরে দিয়েই ঘুরে আসতে হোত।

আমরা সব নিস্তব্ধ; একটা বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাতের সমূহ সম্ভাবনা – কারও একটা মারধোর খাওয়ার দিন ঘনিয়ে এল, আমরা সময় গুনছি।

এদিকে হয়েছে কি, ঠিক সেই সময়েই প্রসূন ক্লাস থেকে ফিরে এসেছে। টেবিলে বইয়ের ব্যাগ রেখে তৈরী হচ্ছে চান করতে যাবার জন্য। সেতো আর ঠিক তার আগের ঘটনা কিচ্ছুটি জানেনা, তাই পরিস্থিতি সম্পর্কে তার কোন ধারণাই নেই। অভ্যেসমত সে শার্টটা টেনে গলায় তুলে খুলেছে, গেঞ্জীটাও খুলেছে, বেল্ট আলগা করে প্যান্টটাকে নামিয়ে তার থেকে পা-টা বার করেছে, পরণে অবশ্যই শুধু জাঙ্গিয়া – তোয়ালেটা হাতের কাছে, কোমরে জড়িয়ে দরজা টপকে বাথরুমে গিয়ে ঢুকবে।

ঠিক এই ব্রাহ্মমুহূর্তে দড়াম করে দরজা খুলে উদ্দাম রাগত, বিক্ষুব্ধ ওয়ার্ডেন-এর আবির্ভাব ও প্রবেশ। স্বভাবসিদ্ধভাবে দক্ষিণ ভারতীয় উচ্চারণে গলা তীব্রমধ্যমে তুলে কিছু বলতে শুরু করবেন, হঠাৎ নজরে পড়ল ঘরের মধ্যে দাঁড়ানো একা প্রসূন। একটা তালঢ্যাঙা (ওয়ার্ডেন-এর উচ্চতার কাছাকাছি), রোগা, লোমশ ছেলে, হাতে তোয়ালে, পরণের জাঙ্গিয়াটুকু বাদে সম্পূর্ণ নিরাবরণ, খুবই নির্দোষ এবং চমকানো চোখে তাকিয়ে আছে, এক পা দরজার দিকে বাড়ানো। এহেন দৃশ্যের সম্মুখীন হয়ে ওয়ার্ডেন-এর কথার খেই হারিয়ে গেল। যেরকম আউটরেজ নিয়ে ছুটে এসেছিলেন, সেটা দপ করে নিবে গেল বোধহয়। এবং সেই অবস্থায়, জাঙ্গিয়াবান প্রসূন আর কি করবে বুঝতে না পেরে হঠাৎ বিনা কারণে ওয়ার্ডেন-কে একটা প্রণাম করে বসল।

এই পরিস্থিতিতে কি আর কাউকে চড়থাপ্পড় কষানো যায়? ওয়ার্ডেন একবার ঢোঁক গিলে, “ইরে, প্যান্টটা পরো!” বলে সটান অ্যাবাউট টার্ন করে চলে গেলেন। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

Advertisements

28 thoughts on “সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি

  1. হুম, এই তো ক্রমে ঝুলি থেকে মেকুর বেরিয়ে আসছে। বাল্টিমোরে তোমার ‘স্ত্রী’র রন্ধিত ভোজ্যদ্রব্য সমাপনান্তে সকড়ি হাতে যেসব গল্পগুলো হত সবকটাই একে একে লিখে ফেল।

    • অহো অর্বাচীন হতভাগ্য! স্ত্রী শব্দের অগ্রে পশ্চাতে scare quote লাগাইতে একটুও কি হস্ত প্রকম্পিত হয় নাই? ত্বরা নাই, অপেক্ষা করিতেছি সেই সুদিন-এর জন্য, যেই দিন তুই কোন গুণবতী রমণীর পাণিগ্রহণ করিয়া আসিবি। তৎপশ্চাৎ দেখিব, তোর উল্লম্ফন কত দূরবর্তী হয়।

      • পেয়েছি, পেয়েছি, ইউরেকা, ইউরেকা! রিনি দিদিমণির দাক্ষিণ্যে এবং Google দেবতার প্রসাদে খুঁজে পেয়েছি সেই মহার্ঘ ব্লগ, যেখানে শকুন্তলা দেবী মাঝে মাঝে দয়া করে দেখা দেন।
        http://bokombokom.blogspot.com/
        Friends, Romans and Countrypersons, lend yourselves your eyes and read this. বোন বলে বলছি না, she wields a really interesting pen… erm, keyboard.

  2. প্রসূনবাবু এখন কোথায় আছেন? ওনার পায়ে আমারও একটা প্রণাম রইল। ওনার, আর ওনার প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পায়েও।
    লেখাটা দুর্দান্ত হয়েছে। ছবির মতো। খুব মজা পেলাম।

    • সে এখন এক নামকরা কারীগরি সংস্থার সহকারী মুখ্য আধিকারিক, তবে তার কথাবার্তা শুনলে মনে হয় যে আণ্ডাবাচ্চা হয়ে গেলেও সেই জাঙ্গিয়াবান দিনগুলো এখনো পুরোপুরি বিগত হয়নি!! 😀
      লেখাটায় তুমি মজা পেয়েছ শুনে পরম পুলকিত বোধ করছি।

  3. লোকজন এত ভালো লিখেও এমন বিনয় করে, যে নিজের ব্লগ টা আজকাল কাউকে দেখাতেও লজ্জা করে।
    😦
    আর সত্যি, জাঙ্গিয়া পরে প্রণাম টা জাস্ট হাইট। কিছু বলার নেই।

  4. আচ্ছা তোমার কখন মনে হয় না, যে আমরাই কেন এই জেমদের চিনি? আর, তারপর খুঁজে খুঁজে জেমবাজ রা আবার এককাট্টা হই? সত্যি, প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে…

  5. পিংব্যাকঃ আরামকেদারায় বসে দুই পা নাচাই রে… | haw-jaw-baw-raw-law, or হ-য-ব-র-ল

কেমন লাগল? লিখে ফেলুন!

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s