দৈর্ঘ্য প্রস্থ শশব্যস্ত

সেই ছোটবেলা থেকে – ইন ফ্যাক্ট, জ্ঞান হওয়া ইস্তক – দেখে আসছি যে আমার স্বর্গাদপি গরিয়সী জননী বেশ একটু ইয়ে, মানে, চওড়া মতন। সেই তুলনায় আমার বাবা বেশ অপেক্ষাকৃত রোগাসোগা। অনেকটা সেই ভানু ব্যানার্জীর রসিকতার মতন, যেখানে মুখ্য প্রোটাগনিস্ট-এর গলায় ভানু তার গৃহিণীকে বলছেন, “ই-ই-ই-স! রিক্সায় উইঠ্যা বইলে রিক্সাওলায় পর্যন্ত কয়, বাবু, আপনে মাইজীর কোলে চইড়্যা বসেন!” অথবা যেখানে মনের দুঃখে প্রোটাগনিস্ট-এর গৃহিণী অশ্রুবিধুর গলায় বলছেন, “তাই বলে এই ভর সন্ধ্যেবেলা তুমি আমার চেহারা তুলবে, শরীর তুলবে?” তাতে ভানু বলছেন, “না না, শরীর তুলুম ক্যান। শরীর তুলুম মনে করলে তো ওয়েট লিফটার হইতাম!” এই দুটোই আবার ক্যাসেট-এ শোনার আগেই আমি মা’র কাছেই প্রথম শুনি।

কিন্তু সেই নিয়ে আমার মনে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা আফশোস ছিলনা। মা’র পেটে দু’দুটো মেজর অপারেশন হয়ে যাবার দরুণ পেটের পেশী আর চামড়া তাদের প্রাক্তন আকারে ফেরেনি, অন্য পাঁচজনের মত মা সহজে পেটে চাপ দিয়ে সামনে ঝুঁকে কিছু করতে পারত না – ফলে ধীরে ধীরে মা’র মধ্যপ্রদেশ বেশ বৃহদাকার ধারণ করে। কিন্তু তা হলে হবে কি! মা’কে আমি বরাবর খুব কর্মঠ দেখে এসেছি। মা’র হাতগুলো (আপার এবং লোয়ার আর্ম) বেশ শক্তিশালী ছিল, এবং মা’র পাগুলো থামের মত ছিল – মানে সেই ছায়াদেবীর পদিপিসির একদম অপোজিট। মা সবসময়ে ভীষণ দৌড়ে চলাফেরা করতে পারত, এবং বাঙালীর স্বভাবানুযায়ী আমরা যখন ফি-বছর কোথাও না কোথাও বেড়াতে যেতাম, তখন মা বোঁচকা-গাঁটঠি সামলে, আমাকে সামলে, সবকিছু সামলে দিব্যি ম্যানেজ করে দিত, পুরো দশভূজা মোড্‌।

অর্থাৎ কিনা, বড় হয়ে স্থূল বা স্থূলকায়া শব্দটার যখন অর্থ অনুধাবন করেছি, তখন সেটার সঙ্গে মা’কে একদমই মেলাতে পারিনি। একবার কোন একটা পরীক্ষা করে ডাক্তার বলেছিল যে সাধারণ বাঙালী মহিলাদের তুলনায় মা’র হাড়গুলো অনেক চওড়া, তাই বয়সকালে ভেঙেটেঙে যাবার সম্ভাবনা কম। দিদিমার কাছে শুনেছি মা বরাবরই চওড়া ধরণের ছিল, ছোটবেলা থেকে; মা’র প্রিয় খাদ্য ছিল বড়মা (দিদিমার মা)-র হাতে তৈরী খিচুড়ী, যেটা কিনা বাড়িতে বানানো হলে মা একাই একটা ছোটখাট গামলা নিয়ে সাবড়ে দিত – এবং মা’র প্রিয় খেলনা ছিল একটা বেমক্কা ভারী পুতা, অর্থাৎ একটা লম্বাটে পাথরের টুকরো, যেটাকে পাটা-র ওপর ফেলে সেটা দিয়ে ঘষে ঘষে জিনিসপত্র বাটা হোতো। মা নাকি সেইটাকে বেশ মুগুর স্টাইলে ঘুরিয়ে আনন্দ পেত, আর কেউ নিয়ে নিতে চাইলে জাপ্টে ধরে বলত সেটা তার ছেলে। [না না, সুধীজন, চিন্তা করবেন না – অন্তত জ্ঞান হবার পর থেকে আমাকে মার হাতের মুগুরের ঘুর্ণায়মান গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়নি।]

তবে হ্যাঁ, একটা কথা না বললে অপরাধ হয়, মা’র মধ্যদেশ স্ফীতাকার হবার দরুন কোলে উঠে হেব্বি আনন্দ পাওয়া যেত – বেশ একটা আলাদা সীটের মত, বিনা কষ্টে পয়েন্ট এ থেকে পয়েন্ট বি পর্যন্ত ল্যাটেরাল ট্রান্সলোকেশন হয়ে যাচ্ছে, তার মজাই আলাদা। অনেকটা যেন সেই নায়াগ্রা জলপ্রপাতের পাশে ক্যানাডার দিকটায় স্কাইলন টাওয়ারের দেওয়ালের বাইরের কাচঘেরা লিফটের মত – চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে আনন্দে ভাসতে ভাসতে উর্দ্ধপানে উঠে যাওয়া যায়। বড় (এবং তৎসহ, ভারী) হয়ে যাওয়ার পরে আর যখন মা’র কোলে ওঠার বায়নাটা ঠিক আর করা গেলনা, এই একটা ব্যাপার বড়ই মিস্‌ করেছিলাম।

[দীর্ঘশ্বাস]

যাউকগ্যা। তো কথা হইতাসে কি… আমাদের আবাসিক বিদ্যালয়ে সপ্তাহের শেষে শনি-রবিবারগুলো সময় দেওয়া হোত বাড়ির লোকজনের সঙ্গে দেখা করার জন্য। সেইরকমই কোন এক অবকাশে প্রসূন (হ্যাঁ, সেই প্রসূন!) আমার মা-কে চাক্ষুষ দেখে। কয়েকদিন বাদে, কোন একটা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রসূন তার সুচিন্তিত অভিমত জানাল – “দত্তর মা… স্বাস্থ্যবান”
শুনে আমার এত হাসি পেল, যে ব্যাকরণ শুদ্ধ করে দেবার বদলে বলেই ফেললাম, “স্বাস্থ্যবান আবার কি? মোটা বললেই তো হয়!”
প্রসূনের তড়িদ্গতিতে জবাব, “তাহলে তো আমার মা’কে হাতি বলতে হয়!”


Advertisements

14 thoughts on “দৈর্ঘ্য প্রস্থ শশব্যস্ত

  1. “গৃ : থামো তুমি! অল্প বয়েসে বিয়ে হলে সবাই মোটাই হয়ে যায়।
    ভা: কার অল্প বয়স!? তোমার?
    গৃ : হ্যা। বিয়ের আগে আমি মোটে ২২টা বসন্ত দেখেছি .
    ভা: মোটে ২২টা দেখসো ! কত বসন্ত অন্ধ হইয়া ছিলা ?”
    যদি কোনওদিন আমার আর আমার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়, মানে একসঙ্গে, তোমাকে পুরো এই “কর্তা বনাম গিন্নী” কমিক টা করে শোনাব। ছোটবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এইটার সঙ্গে।
    bher bhery good হয়েছে !!!

  2. “বড় (এবং তৎসহ, ভারী) হয়ে যাওয়ার পরে আর যখন মা’র কোলে ওঠার বায়নাটা ঠিক আর করা গেলনা, এই একটা ব্যাপার বড়ই মিস্‌ করেছিলাম।” – ei du:kkhei kobi geyechhen “jiski biwi moTi, uska bhi baDa naam hai”

    • হায়, আমার সেই উপায়ও নেই যে… আমি আমার গৃহিনী কোলে উঠে বসলে তিনি অচিরেই ক্যালেণ্ডার-দশাপ্রাপ্ত হবেন। মা’র কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে আমি প্রস্থের পরিমাপটা যোগাড় করেছি কিনা!

  3. মাঝের একটা লাইন ভুলে গেছি!

    গৃ : নাঃ সবাই তোমার মতন প্যাকাঠি হবে! দেখলে মনে হয় সংসারে দুর্ভিক্ষ লেগেছে!
    ভা: হ।আর তোমারে দেখলেই বোঝে দুর্ভিক্ষের কারণ টা কি!
    গৃ : থামো তুমি! অল্প বয়েসে বিয়ে হলে সবাই মোটাই হয়ে যায়।
    ভা: কার অল্প বয়স!? তোমার?
    গৃ : হ্যা। বিয়ের আগে আমি মোটে ২২টা বসন্ত দেখেছি .
    ভা: মোটে ২২টা দেখসো ! কত বসন্ত অন্ধ হইয়া ছিলা ?” 😀

  4. আমার মা-ও, ইয়ে, কিঞ্চিৎ পৃথুলা। আর উত্তরাধিকারসূত্রে আমিও সেই স্ফীতোদর লাভ করেছি। তবে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের থেকে কিছু কম চিত্তাকর্ষক নয় আমার মায়ের জিন্‌, কাজেই যা পেয়েছি তা নিয়ে দিব্যি কেটে যাচ্ছে।

    খুব ভাল লিখেছ!

কেমন লাগল? লিখে ফেলুন!

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s