স্থানান্তরের আতান্তরে

আবার সে এসেছে ফিরিয়া! এক্কেবারে পাগলা দাশুর স্টাইলে এনট্রি নিয়ে।

সুধীজন, হঠাৎ করে হাপিস হয়ে যাওয়ার জন্য যারপরনাই দুঃখিত। শেষবার আপনাদের সঙ্গে কথা হবার পরে পরেই জীবন বাবাজী – হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই দৈনন্দিন জীবনের কথাই বলছি – হঠাৎ এসে কলার চেপে ধরল, কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করল, “ইয়ার্কি হচ্ছে, চাঁদু? সামনে একটা বড় কাজ পড়ে রয়েছে, তার বন্দোবস্ত কে করবে?” খ্যাঁচানি খেয়ে সম্বিত ফিরল, সত্যিই তো, মার্চের মাঝামাঝি আমাদের বাড়ি বদল করার কথা – তার তো গোছগাছ শুরু করতে হয়।

এদেশে লোকে সাধারণভাবে এই ধরণের কাজের জন্য প্রোফেশনালদের ভাড়া করে, তারাই এসে সমস্ত বাড়ি ঘরের জিনিষপত্র গুছিয়ে গাছিয়ে যত্ন করে বাক্স প্যাটরা বেঁধে ব্যবস্থাদি করে সবকিছু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাচার করে দেয়। সাড়ে চার বছর আগে আমরা যখন এই দেশের উত্তরপশ্চিম প্রান্ত থেকে দক্ষিণপূর্বমুখী হলাম, তখন এক কোম্পানি আমাদের জন্য সেই মহাকার্য সমাধা করে দিয়েছিল, অবশ্যই কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে। কিন্তু এবার আর সেই তালে ঢুকতে মন চাইল না, তার সবচেয়ে বড় কারণ হল আমাদের এবারের মুভটা নিতান্তই সমান্তরাল। যে অ্যাপার্টমেন্ট-এ থাকতাম, সেই বিল্ডিং-এর পাশের বিল্ডিংটায়, সেই একই এক ফ্লাইট সিঁড়ি উঠে নতুন বাড়ি – তফাৎ শুধু এক বেডরুম থেকে দুই বেডরুম, সুযোগ্যা সহধর্মিণীর-এর সঙ্গে ঝগড়া হলে একটা ভদ্রস্থ গোঁসাঘরের আয়োজন আর কি, নইলে কাঁহাতক আর সিড়িঙ্গে বাথরুম-এ ঢুকে বসে থাকা যায়?

সে যাকগে, আমরা দু’জনে একমাথা হয়ে ঠিক করলাম, যে ভাঁজ করে রাখা (হেঁহেঁ, কি দূরদর্শিতা!) পুরোন কার্ডবোর্ডের বাক্সগুলোকে আবার করে বানিয়ে, তাতে করে জিনিষপত্র গুছিয়ে দেব। জিনিষপত্র বলতে আর কি, জামাকাপড়, হাবিজাবি টুকিটাকি, আর গুচ্ছের খানেক বই, সিডি আর ডিভিডি। যেমন চিন্তা, তেমন কর্ম। দৈনন্দিন কাজকর্ম সামলে সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে গোছানোর পালা। যারা বই একজায়গা থেকে অন্যত্র চালাচালি করেছেন, তারা বিলক্ষণ জানেন – বইয়ের বাক্সের কি ওজন হয়। এক একটা বাক্স, বন্ধ করার পর নাড়াতে গিয়ে মনে হল থান ইঁটে বোঝাই। কি আর করা, সেই সূত্রে শরীরের আদৌ-আছে-বলেই-ভুলে-গেছি এরকম বিভিন্ন মাংসপেশী শ্রেণীসমূহের সঞ্চালন ঘটল। কিন্তু অচিরেই অনুধাবন করলাম যে আমাদের দুজনের পক্ষে সেই সমস্ত বাক্স সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে উঠিয়ে পাশের বিল্ডিং-এ নিয়ে পৌঁছনো রীতিমত অসাধ্য। সপ্তাহ খানেক সময় পেলে হয়ত করা যেত, কিন্তু আমাদের হাতে সময় শুধুমাত্র একটা শনিবার।

অগত্যা শরণাপন্ন সেই জগৎ-জোড়া-জালের ওপর। এদিক ওদিক ঘেঁটে এক কোম্পানীকে পাওয়া গেল, যারা আশ্বাস দিল, যে তারা কিয়ৎপরিমাণ অর্থের বিনিময়ে আমাদের দুটো ঘন্টা সময় দিতে পারে, তার মধ্যে যা হবার তা হবে। উপায় নেই; তাই আমরা তাড়াহুড়ো করে যথাপরিমাণ সব কিছু বাক্সবন্দী করায় ব্রতী হলাম, বুক-কেস-এর র‍্যাক এবং চেস্ট অফ ড্রয়ার-এর ড্রয়ার গুলো খুলে আলাদা করে দিলাম, খাট-টাট খুলে টুকরো টুকরো করে ফেললাম। (এটায় অবশ্য সাংঘাতিক কৃতিত্বের কিছু নেই, সুইডিশ কোম্পানী আইকিয়া-র জিনিষ, দোকান থেকে কিনে নিজেরাই তৈরী করে নিতে হয়, আবার প্রয়োজন মত সন্ধিবিচ্ছেদ করে টুকরো করে নেওয়াটাও খুব একটা অসুবিধাজনক নয়।)

কি ভাগ্যিস শুক্রবার রাত্রে নতুন বাড়ির চাবিটা যোগাড় করা গেছিল। আমরা তাই ভাবলাম, যে একটু একটু করে অন্তত রান্নাঘরের সামগ্রীগুলো হাতে হাতে সরিয়ে ফেলি। কাজ যতটা এগিয়ে থাকে। হরি হে দীনবন্ধু। এগারো বছর এই দেশে থাকার সুবাদে আমরা কত কিছু যে জিনিষপত্র জড়ো করেছি, তার ইয়ত্তা নেই। এমন মশলা বেরিয়ে পড়ল, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা অবহিত ছিলাম না। এমন কাপপ্লেট-র আবির্ভাব ঘটল তাকের পিছন থেকে, তারা যে কখন কোনফাঁকে স্টেলথ মোড অবলম্বন করে আমাদের রান্নাঘরে কবে হামলা করেছে, তার কোন নথিপত্র নেই। আর সেই সব জিনিষপত্রকে জামাই আদরে নিয়ে যাওয়াও এক প্রকাণ্ড ঝামেলার ব্যাপার। যাকগে, তাও গভীর রাত পর্যন্ত এক গর্ত থেকে অন্য গর্তে সে সব টানাহ্যাঁচড়া করে ক্লান্ত হয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম।

শনিবার সকাল, ফোন করে চলে এল সেই কোম্পানীর প্রতিনিধিদ্বয় – আমাদের গেরস্থালির স্থানান্তরীকরণে সাহায্য করতে। আমরা আশা করেছিলাম বেশ অভিজ্ঞ ধরণের হাট্টা কাট্টা নওজোয়ান কেউ আসবে। ও হরি। এল একজন দোহারা গড়নের শ্বেতাঙ্গ অ্যামেরিকান ছেলে, এবং তার বন্ধু একটি ক্ষীণদেহী বেঁটেখাটো কৃষ্ণাঙ্গ অ্যামেরিকান ছেলে, বয়স কিছুতেই ষোলো থেকে আঠেরোর বেশী হবে না। বিজ্ঞাপনের সঙ্গে ঠিকমত না মিললেও তারা বলল ঠিক ম্যানেজ করে নেবে; কোঁকড়া চুলের কালো ছেলেটি একগাল হেসে বলল, তাকে দেখতে ছোটখাট হলেও সে তার বন্ধুর সঙ্গে এইরকম কাজ হামেশাই করে থাকে। অনতিবিলম্বে তারা শুরু করে দিল জিনিষপত্র সরানো।

কথা ছিল যে তৈরী করে রাখা বন্ধ বাক্সগুলোর আগে ব্যবস্থা করে তারপর ফার্ণিচারগুলো যাবে। ভিতরের ঘরে আমি তড়িৎগতিতে গোছগাছ করছি, হঠাৎ শুনি বাইরের ঘরে প্রচণ্ড কসরতের আওয়াজ, যেন জিমখানায় লোকে লোহালক্কড় টানছে। তাড়াতাড়ি বাইরে এসে দেখি বাবাজীবনেরা বইয়ের বাক্স নিয়ে ধ্বস্তাধস্তি করছে, একটাকে হাতে তুলতে গিয়ে আর সোজা হতে পারছে না। আমাকে দেখেই প্রথম প্রশ্ন, তোমরা কি চাকরী কর? এই বাক্সে কি ভরেছ? তাদের আশ্বস্ত করলাম, এতে কোন মৃতদেহ বা লোহার ওজন ইত্যাদি নেই, শুধু বই আছে। মনটা ঝাঁ করে ফ্ল্যাশব্যাক-এ চলে গেল, বহুবহু বছর আগে, এক বন্ধু কলকাতা থেকে প্রথম বার আসার সময়ে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে তার লাগেজ হারিয়ে ফেলেছিল, তার মধ্যে তার বই ঠাসা ব্যাগ-ও ছিল। দু’দিন বাদে ভোর ছ’টার সময় সেই ব্যাপ ডেলিভারী করে গেল বিমানসংস্থার লোক, সেও পুস্তকভারে অবনত ছিল – ধপাস করে ব্যাগটা মাটিতে ফেলে জিজ্ঞেস করেছিল, এটা এত ভারী কেন? তাকে আমি কি কৈফিয়ত দেব বুঝতে না পেরে বলেছিলাম, জ্ঞান অতি ওজনদার বস্তু, নলেজ ইস প্রিটি হেভী স্টাফ, ইউ নো।

দু’ঘন্টার মধ্যে বাক্স সমস্ত আর ফার্ণিচার পাচার করে বালকদ্বয় তো অন্তর্হিত হল। আমরা ভাবলাম, বাকি জিনিষপত্র আর এমন কি, আমরা ঠিক ম্যানেজ করে নেব। সেই সব সরিয়ে উঠতে – শুধু এই মুল্লুক থেকে ওই মুল্লুক, গুছানোর প্রশ্ন নেই – সেদিন আমাদের আরো সাত ঘন্টা এবং রবিবার নয় ঘন্টা লেগেছিল। ভালর মধ্যে ভাল এই যে, শনি-রবি-সোম রাত্রিবেলায়, সাধারণত যে আমার নাসিকা গর্জনের প্রকোপে আমারই মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে যায় আর বেচারী গৃহিণীকে কানে বালিশ চাপা দিয়ে ঘুমোতে হয়, এই তিন রাত আমরা দু’জনেই পপাত চ মমার চ অবস্থায় ঘুমিয়েছি নিঃসাড়ে।

ঠিকানা বদলের বহু প্যান্তাখ্যাচানি আছে, গ্যাস, ইলেক্ট্রিসিটির অফিস, পোস্ট অফিস, ব্যাঙ্ক, ক্রেডিট কার্ড, কেবল টিভি এবং ইন্টারনেট-এর অফিসে ফোন করে সব বদলাতে হয়, পুরোন ঠিকানায় পরিষেবা বন্ধ করিয়ে নতুন ঠিকানায় চালু করাতে হয়, তারপর আবার অনাগরিক হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারকে ঠিকানা বদলের খতিয়ান দিতে হয়; ধীরে ধীরে সে সব হয়েছে। একটু একটু করে দু’জনে মিলে বাড়িও গুছোতে শুরু করে দিয়েছি। সর্বাগ্রে কোনটা গুছিয়ে ফেলেছি, সেটা অনুমান করার জন্য আশাকরি প্রাইজ-এর প্রয়োজন হবে না, হেঁহেঁ, কি বলেন?

বইয়ের পাহাড়

Advertisements

13 thoughts on “স্থানান্তরের আতান্তরে

  1. দারুণ দারুণ দারুণ হয়েছে ! উফফ আমার তো ভাবতেই ভয় করছে, এই রকম আমাদেরও বাড়ী বদলাতে হবে এই মাসের শেষের মধ্যেই! আমাদেরও ঐরকম তিন বুকশেল্ফ ভর্ত্তি বই। কান্না পাচ্ছে। 😦
    তোমার লেখার মারফতে আমি এখন ভবিষ্যতে পৌছে গেছি।

    • ধন্যবাদ। তবে আনপ্যাকিং-এর আর বিশদ খুব একটা নেই। বাক্স ধরছি, ওপরের লাগানো টেপ-গুলো প্রাগৈতিহাসিক জিঘাংসার সঙ্গে ছিঁড়ে ফেলছি, আর নাড়ীভুড়ি – থুরি, ভিতরের জিনিষপত্র – বার করে এদিক ওদিক গুঁজে ফেলছি, এই আর কি। এই সূত্রে মনে পড়ে গেল, সেই শৈশবে দেখেছিলাম বাড়ির কাছে দেওয়ালে চিপকানো হিন্দী সিনেমার বাংলা পোস্টার, ছবিবিহীন গোলাপি এবং নীল ফণ্ট সম্বলিত টেক্সট-ভিত্তিক পোস্টার – তাতে লেখা, [ছোট অক্ষরে] ধর্মেন্দ্র যা করে [পরের লাইনে বিশাল অক্ষরে] খুলে আম [আবার পরের লাইনে ছোট অক্ষরে] করে। সিনেমার নাম বুঝি ছিল “খুলে আম”; কিন্তু আমাদের হিন্দীবিবর্জিত শিশুমনে বড়ই প্রশ্ন জেগেছিল, খুলে আম মানে কি। এক ক্লাসের বড় দাদা সদয় হয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল, ওটা আমের বাক্সের বিজ্ঞাপন। বোম্বাই, চৌসা, চসেরী, ফজলী, আলফোন্সো, ইত্যাদি নানাবিধ চমকপ্রদ আম বাক্সবন্দী হয়ে বাজারে পৌঁছায়, অতএব সেই মহার্ঘ বাক্স – খুলেই, আম।

    • খোকা, প্রাণে বড়ই বসন্তের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, নাকি? দ্বিতীয় শোয়ার ঘরটি অতিথি সৎকারার্থে ব্যবহৃত হবে। অতএব, এবার যদি বল্টিমোর আসিস, তাহলে…

  2. আমি মুভ করা নিয়ে কিছু বলব? কৌশিক দা? 😀 আমাকেও বাড়ি বদলাতে হবে (হ্যাঁ, আবার, সেপ্টেম্বর এ্‌, কিন্তু আমি এখন প্রফেশানাল মুভারদের লজ্জা দিতে পারি। জীবন-মৃত্যু-পায়ের-ভৃত্য-চিত্ত-ভাবনাহীন।

    • যেমন হিন্দীতে বলে, নেকি ঔর পুছ পুছ? নেহাত এখন থিসিস-এর ঝামেলা, তাই সজ্ঞানে গুঁতোচ্ছি না… হেহে! 😀 অপেক্ষায় রইলাম ব্লগতিয়ার খিলজীর নেক্সট ইনস্টলমেন্ট-এর।

  3. বাব্বাঃ, (ভানু স্টাইলে) বাড়ি বদলের এ—ত্তো বড় কাহিনী! আমাগো সময় তো এইসব কোম্পানিগুলা siল না। তাই নিzeরাই কোনরকমে বাক্স প্যাঁটরা বোঁচকা গাট্‌ঠি সামলাইয়া এগ্‌খান ম্যাটাডোরের উপর চাপাইয়া রে রে শব্দে এক zaয়গা থিকা অন্য zaয়গায় পদার্পণ। zaউকগা, আপনেরা নূতন বাড়িতে মঙ্গলমতে থিতু হইসেন। অখন আরাম কইর‍্যা দুইজনে নাক ডাকেন গিয়া।

    • এত রাত্র কইর‍্যা zaইগ্যা থাকো বইলাই শরীরের এই হাল। ম্যাটাডোর হইলে তো মুশকিল আsiলো না; কিন্তু এক বিল্ডিং থিক্যা পাশের বিল্ডিং মালপত্র টাইন্যা লইয়া zaইব কোন ম্যাটাডোর-এ?

কেমন লাগল? লিখে ফেলুন!

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s