চেয়ার-এর চে’ আর বিপজ্জনক কিছু আছে নাকি?

চেয়ার বা কেদারা বা কুর্সি বা আসন – ইত্যাদি দেখলে আপনাদের কি অনুভূতি হয়, বন্ধুরা? ধরুন, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করছেন বা হাঁটাহাটিঁ করে এসেছেন, হঠাৎ একটা চেয়ার দৃষ্টিগোচর হল, ঠিক তখন মাথায় কি ধরণের চিন্তা খেলে যায়? ইচ্ছে করে না, তৎক্ষণাৎ কাছে টেনে নিয়ে গা টা এলিয়ে দেন? ক্লান্ত কোমরটাকে দু’দণ্ড একটু শান্তি দেন? হয়রান হাঁটুদুটো খানিক জিরিয়ে নেন? সাধু সাবধান। এই চেয়ার অতিশয় বিপজ্জনক বস্তু – অত্যন্ত খামখেয়ালি, এই মুহূর্তে আছে বলে যে পরের মুহূর্তেও স্বস্থানে থাকবে, এরকম কোন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারেনা।

কেন, বলি? দুর্জনে গাছের উপর তুলে মই কেড়ে নেয় বলে অবগত আছেন নিশ্চয়? চেয়ার-এর ক্ষেত্রে তা আরও সাংঘাতিক, চিন্তা করে দেখুন, কারণ বৃক্ষারোহণের পরিশ্রমটুকু করতে হয় না; বরং পরম নিশ্চিন্তে, পরম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আপনি আপনার পশ্চাদ্দেশটি বেশ সুবিবেচিত ভাবে নামিয়ে আনছেন মাধ্যাকর্ষণের আহ্বানে সাড়া দিয়ে, মনে মনে অপেক্ষা করছেন – এই এল, এই লাগল বুঝি চেয়ারের পাটাতনের ছোঁওয়া, চেয়ার-এর প্রশস্ত অঙ্কতল যেন হাল্কা চুমু দিয়ে সাদরে আপ্যায়ন করে নিল আপনার পশ্চাদ্দেশকে, ঠিক যেমন অবরোহণকালে এয়ারক্রাফটের তিনজোড়া বা তদোধিক চাকার টায়ারগুলোকে উষ্ণচুম্বনে আলিঙ্গন করে নেয় রানওয়ের জমি। কিন্তু মুশকিল হল, যে রানওয়ে রানওয়ের মত পড়েই থাকে, পালিয়ে যায়না। কিন্তু চেয়ার-এর সম্পর্কে কি বুক ঠুকে আপনি একই কথা বলতে পারেন? এক সেকেণ্ডের ভগ্নাংশ আগে চোখের কোণ দিয়ে দেখে নিয়ে যে সমতল-এর অবস্থিতি সম্পর্কে আপনি নিঃসন্দেহ হয়েছিলেন – সেই ভগ্নাংশ পরেও সে সেখানেই বর্তমান থাকবে তা কি নিশ্চিত? মনে রাখবেন সেই আপ্তবাক্য, কখন কি ঘটে যায়, কিচ্ছু বলা যায়না।

এই যেমন, ধরুন, চল্লিশজন ছাত্রের ক্লাসরুম। টিফিনের ঠিক পরের পিরিয়ড – রাশভারী, সহকারী প্রধানশিক্ষক ইংরেজী পড়াতে ঢুকবেন। আরও ধরুন, উনি অত্যন্ত সময়ানুবর্তিতার পক্ষপাতী। উনি ক্লাসে পদার্পণ করার পর আর কারও প্রবেশানুমতি নেই। মনে করুন, নতুন ছাত্রটি, সবে মাসখানেক আগে অষ্টম শ্রেণীতে এসে যোগদান করেছে এই আবাসিক বিদ্যালয়ে, এবং এখনও সেরকরম বন্ধুবান্ধব গড়ে ওঠেনি। ক্লাসরুমে তিনটে সারি, প্রত্যেক সারিতে সাতজোড়া করে ডেস্ক এবং চেয়ার। করিডোরের পাশেই ক্লাসরুম, একমাত্র প্রবেশদ্বারের দুই দিকে দুটো বড়ো জানলা এবং উল্টোদিকের দেওয়ালেও আরও একজোড়া জানলা। নতুন ছাত্রটির সীটটা দরজা দিয়ে ঢুকতে ডানদিকের জানলার পাশেই, আর তার পাশে বসে তার সহপাঠী একজন – ধরা যাক তার নাম অনির্বাণ।

নতুন ছাত্রটি করিডোরে দাঁড়িয়ে আকাশকুসুম করছিল, হঠাৎ খেয়াল হল, আরে! অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার তো অফিস থেকে বেড়িয়ে পড়েছেন, কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই ঢুকে পড়বেন। তাড়াতাড়ি করে নতুন ছাত্র ক্লাসে ঢুকে পড়ল, ডানদিকে ঘুরে নিজের চেয়ার-এর দিকে পা বাড়াতে না বাড়াতেই দরজা দিয়ে স্যার ঢুকলেন। সবাই দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করল নিয়মমাফিক। নতুন ছাত্রটি অনির্বাণের পিছন দিয়ে ঢুকে নিজের চেয়ার-এর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

এইবার মনে করুন কোন অস্কার বিজয়ী সাদাকালো চলচ্চিত্রের সীন, প্রচণ্ড আঁতেল পরিচালক সেই সীনটার প্রত্যেকটা মুহূর্তকে পরিস্ফুট করে তুলতে ক্যামেরার স্পীড ভীষণ কমিয়ে দিয়েছেন, পতনশীল সবকিছুই দশ সেকেণ্ডের বদলে দশ মিনিটে পড়ছে, কল থেকে জলের ফোঁটা, চুলের গোড়া থেকে ঘামের ফোঁটা, মিল্কপট থেকে ধূমায়িত চায়ের কাপ-এ দুধের ফোঁটা ইত্যাদি – পড়বে, ছ্যাতরাবে, ছিটকে ছাপ্পান্ন হবে আর প্লত্‌ করে আওয়াজ হবে, তাতে দর্শকদের সমবেত প্রাণে পুলক উথলে উঠবে – অনেকটা সেই রকম আরকি।

নিজের চেয়ার অব্দি পৌঁছে স্যার এবার ঘুরবেন, ব্ল্যাকবোর্ডকে পিছনে রেখে ছাত্রদের দিকে তাকাবেন, হাত তুলে বসতে বলবেন, নিজের চেয়ারটা টেনে বার করবেন, হাতের কাগজপত্র টেবিল-এ রাখবেন, ঢুকে চেয়ার-এ গাত্রপাত করবেন, এবং তারপর পড়াতে শুরু করবেন। সবটাই কয়েক সেকেণ্ডের কাজ, কিন্তু ওই যে বললাম – ক্যামেরা স্লো-মোশন হয়ে গেছে। বসতে গিয়ে নতুন ছাত্রটির হঠাৎ চোখে পড়ল, কি সর্বনাশ! দণ্ডায়মাণ অনির্বাণের পিছন দিয়ে নিজের সীট অব্দি পৌঁছাতে গিয়ে সে অনির্বাণের চেয়ারটা অজ্ঞাতসারে, অনবধানতাবশত সরিয়ে ছিল, কিন্তু তার পরে আর সেটা টেনে জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়নি। এদিকে অনির্বাণ তো সেই চেয়ারের স্থানবিচ্যুতির সম্পর্কে বিন্দুমাত্র অবহিত নয়, এবং সে ধীরে ধীরে তার পশ্চাদ্দেশটি নামিয়ে আনছে সেই অঞ্চলের দিকে যেখানে কিছু সেকেণ্ড আগেও তার চেয়ার বিদ্যমাণ ছিল বলে সে জানে।

কথায় বলে মৃত্যুর আগে নাকি সমস্ত জীবনটা ঝাঁ করে চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়। নতুন ছাত্রটি মানসচোক্ষে দেখতে পেল কি পরিণতি ঘটতে চলেছে। চেয়ারের পাটাতনে বাধাপ্রাপ্ত না হয়ে অনির্বাণের পশ্চাদ্দেশ অনির্বাণ সহযোগে অচিরেই সবেগে ভূতলশায়ী হবে। আওয়াজে এবং হট্টগোলে একটা কেলেংকারী কাণ্ড হবে। স্যার পরিষ্কার দেখতে পাবেন যে অনির্বাণের চেয়ার তার স্বস্থানে নেই; সেটা নিয়ে অচিরেই অনুসন্ধান হবে এবং সবার মনে দৃঢ়-প্রতীতি ঘটবে যে নতুন ছাত্রটি লোকের চেয়ার টেনে নিতে অভ্যস্ত। বন্ধুবান্ধব জোটানো তো দূরস্থান, স্কুল থেকেই বহিষ্কারের প্রশ্ন না চলে আসে।

উপায়ান্তর না দেখে প্রথমে নতুন ছাত্র অনির্বাণের কানে বীজমন্ত্র দেবার স্টাইলে ফিস্‌ ফিস্‌ করে বলার চেষ্টা করল, “অ্যাই বসিস না, চেয়ার নেই!” কিন্তু কা কস্য পরিবেদনা। নিয়তির অমোঘ টানে অনির্বাণের পশ্চাদ্দেশ তার নিম্নগামী গতির কোন হেরফের ঘটাল বলে তো মনে হোলনা। তখন ‘ডেসপারেট টাইমস কল ফর ডেসপারেট মেজার্স’ – এই মনে করে নতুন ছাত্রটি তার হাটুঁ মুড়ে ‘দ’ বা হাফ-চেয়ার-এর ভঙ্গীতে অনির্বাণের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে পড়ল, এবং নট আ সেকেণ্ড আরলীয়ার, কারণ ঠিক তখনই অনির্বাণের পশ্চাদ্দেশ, বলা যায়, রানওয়েতে ল্যাণ্ড করল। করেই যারপরনাই আশ্চর্য হয়ে তড়াং করে লাফিয়ে উঠল। ক্লাস এইটের ছাত্রের রোগা অস্থিচর্মসর্বস্ব হাঁটু আর ঊরুর সার্ফেস কখনই যে চেয়ার-এর মত আরামদায়ক নয়, সে কথা অনস্বীকার্য। তবে সেটুকু সময়ই যথেষ্ট ছিল নতুন ছাত্রের পক্ষে, সে তড়িদ্গতিতে অনির্বাণের চেয়ার টেনে স্বস্থানে ফিরিয়ে আনল। ইংরেজী স্যার তখন সদ্য বসেছেন, কথা বলতে শুরু করবেন এইবার।

গল্পের নীতিকথা কি? চেয়ারদেরকে কোন বিশ্বাস নেই। চেপে বসা পর্যন্ত বিশ্বাস করবেন না যে তারা পিছনে আছে। প্রয়োজন মত তাদের খামচে চেপে ধরতে দ্বিধা করবেন না। আবার বলছি, সাধু সাবধান।


পুনশ্চঃ অবশ্য চেপে বসার পরেও যে তারা পিছনে থাকবেই, এরও কোন গ্যারান্টি নেই অবশ্য। দিল্লীতে আমার ভ্রাতৃসম বন্ধুর দাদার সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীকে বধূবরণের অব্যবহিত পরে একটা চেয়ারে বসতে দেওয়া হয়েছিল। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই সেই চেয়ার চরম বিশ্বাসঘাতকতা দেখিয়ে খণ্ড খণ্ড আলাদা হয়ে গেছিল, নতুন বৌদিকে বাকি সারাজীবনে একটা চিরস্থায়ী গল্পের খোরাক জোগান দিয়ে। অতএব, নিজদায়িত্বে – হেঁহেঁ, বুঝতেই পারছেন!

Advertisements

3 thoughts on “চেয়ার-এর চে’ আর বিপজ্জনক কিছু আছে নাকি?

    • আরে, কুন্তলা যে! শত ব্যস্ততার মধ্যেও এসে কমেন্টানোর জন্য ধন্যবাদ! 😀 আর রইল ‘উপকারী বন্ধু’-র কথা? বাংলায় বলে না, ঠ্যালার নাম বাবাজী? এ এক্কেরে সেই কেস! ওই অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার ভদ্রলোককে বেজায় ভয় পেতাম শুরুতে, ইন ফ্যাক্ট শুরুতে সবাইকেই ভয় পেতাম। সেইখানে ক্লাসের মধ্যে অনির্বাণের পতন ঘটলে কি যে হোতো, তার ইয়ত্তা নেই। অগত্যা…

  1. পিংব্যাকঃ আরামকেদারায় বসে দুই পা নাচাই রে… | haw-jaw-baw-raw-law, or হ-য-ব-র-ল

কেমন লাগল? লিখে ফেলুন!

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s