আরামকেদারায় বসে দুই পা নাচাই রে…

সেই যে ওয়ার্ডেন-এর গল্প করেছিলাম আমার তৃতীয় পোস্ট-এ, আর এই যে চেয়ার-এর গল্প বললাম আমার অষ্টম পোস্ট-এ – দুটোর মধ্যে একটা চমৎকার ছেদবিন্দু আছে, তার নাম ইজি-চেয়ার, বা আরামকেদারা। ছেদবিন্দু বা ইন্টারসেকশন বললাম বটে, কিন্তু বোধহয় একটু অঙ্কের সাহায্য নিতে হবে, একটা ভেন ডায়াগ্রাম আঁকতে হবে, অনেকটা ধরুন এইরকম।

আমি আবার অঙ্কে বেশ কাঁচা, তাই ভুলত্রুটি হলে একটু ক্ষমাঘেন্না করে নেবেন।

আরামকেদারা অবশ্য একটু প্রাচীন কালের জিনিষ, তাই আপনারা কে কদ্দূর দেখেছেন জানিনা। ল্যাপটপের টাচপ্যাডে আঙ্গুল ঘষে ঘষে আঁকা ছবিটাতে ঠিক জাস্টিস হলনা, কিন্তু আরামকেদারা বেশ মজার, এবং নিঃসন্দেহে আরামদায়ক, জিনিষ। আরামকেদারার ফ্রেম-টা দুটো কাঠের আয়তক্ষেত্র। একটু নিচের দিকে তারা ইস্ক্রুপ সহযোগে একে অন্যের সঙ্গে আটকে আছে। ভাঁজ করলে ছোট ফ্রেম-টা নিখুঁত ভাবে বড় ফ্রেম-টার মধ্যে ঢুকে যায়, আবার ভাঁজ খুললে দুটো ফ্রেম-এর ওপরের অংশটা সর্বাধিক দূরত্বে চলে গেলে একটা এক্স আকৃতি ধারণ করে, এবং সেইভাবে মাটিতে বসে। কায়দামত জায়গায় আরো কিছু কাঠের বা ধাতব গোঁজ দেওয়া আছে, তাই জিনিষটা এর চাইতে বেশি আর খোলেনা।

ফ্রেম-এর মধ্যে বসার জায়গাটা কোথায়? সেটাও বেশ মজার। বড় এবং ছোট দুটো ফ্রেম-এরই ওপরের দিকে লম্বা এবং সরু করে প্রস্থবরাবর কাটা আছে। সেই কাটার ফাঁকা অংশটা এতই সরু যে তার মধ্যে দিয়ে খালি এক ফেরতা কাপড় ঢুকতে পারে। এই কাপড় খানাও বেশ স্পেশাল, বেশ মোটা – অনেকটা শতরঞ্চি ধরণের কাপড়। তার মজা হল, যে ওপর এবং নিচ, দুই প্রান্তেই পর্দার মত করে সেলাই করা থাকে। অর্থাৎ কিনা, ধারগুলো ভাঁজ করে এমন করে সেলাই করা হয়, যে তার মধ্যে দিয়ে দেড়-দুই ইঞ্চি চওড়া কাঠের রড ঢুকতে পারে। এই কাঠের রডের দৈর্ঘ্য হল আরামকেদারার প্রস্থের মাপে।

চিত্রটা আশাকরি একটু একটু পরিস্কার হচ্ছে। আরামকেদারার সিস্টেম হল, ওপর এবং নিচের কাটা জায়গাদুটোর মধ্যে দিয়ে কাপড়ের ওপর এবং নিচের অংশটা প্রথমে গলিয়ে দিতে হয়। এরপর পর্দার রডের মত দুই দিকেই কাঠের রড ঢুকে যায়। এতে হয় কি, ওই কাপড়ের ওপর বা নিচটা আর খসে বেরিয়ে আসতে পারেনা, আটকে থাকে। তখন ওই কাপড়টার মধ্যে গা-টা এলিয়ে দিতে হয়। আঃ সে কি আরাম। ওপর নিচ দুই দিকে ফ্রেম-এর মধ্যে আটকে বাকিটা ঝুলে থাকে বলে কাপড়টাতে বসার অভিজ্ঞতা বেশ একটা হ্যামক হ্যামক মনে হয়, অথচ গাছ খুঁজে হ্যামক টাঙ্গানোর জ্বালা নেই, মশার কামড় খাবার বালাই নেই, রোদ জল ঝড়ে চিন্তা নেই – যেখানে সুযোগ, সেইখানেই সটান খুলে বসলেই হোলো। (শকুন্তলা, মনে রাখিস মা, তোর হ্যামক প্রীতির এটা বেশ যোগ্য প্রতিষেধক হতে পারে কিন্তু।)

মাঝে মধ্যে কাপড়টা ধোওয়ার প্রয়োজন পড়লে – ওই যাদের ধোওয়া ধুয়ির বাতিক আছে, তাদের জন্য আর কি – কাঠের রড দুটো খুলে নিলেই হল, সুড়ুৎ করে কাপড়টা বেরিয়ে আসবে, কোন ঝামেলা নেই। আবার পরিস্কার কাপড়টা এনে ঢুকিয়ে রড লাগিয়ে নিলেই কেল্লা ফতে।

এইবার ভেন ডায়াগ্রামের অন্য প্রান্তে আসি। তৃতীয় পোস্টের সেই দক্ষিণ ভারতীয়, রাশভারী এবং বদমেজাজী ওয়ার্ডেন আমাদের। হোস্টেল-এ তাঁর ঘরে তাঁর প্রিয় একটা আরামকেদারা থাকত। সেইখানে তিনি সকালসন্ধ্যে বসতেন এবং হয় অঙ্কের ক্লাস-এর পাঠ্যক্রম ভাঁজতেন অথবা নতুন কোন উপায়ে আমাদের বেদনার উদ্রেক করা যায়, তার উপায় করতেন। আগেই বলেছি, ওনার একটা ফেভারিট পাসটাইম ছিল ছেলেদের কারণে অকারণে মারধোর করা, সাধারণ বাংলা ভাষায় যাকে বলে ‘প্যাঁদানো’ – ঠিক তাই। তবে উনি ঠিক সবসময়ে হাতে মেরে তৃপ্ত হতেন না। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী ওনার শাস্তির আবার রকমফের হোতো। অত্যন্ত গুরুতর কোন অপরাধের জন্য ওনার পছন্দের হাতিয়ার ছিল ওই আরামকেদারার ওপরের রড বা ডাণ্ডাটা। ওই ডাণ্ডাটাকে খুলে নিয়ে সেইটা দিয়ে গায়ে পিঠে উনি হাতের সুখ করে নিতেন। অবশ্য সেই শাস্তির কথা সুবিদিত হওয়ার কারণে ছেলেরা এতই ভয়ে থাকত, যে ডাণ্ডা বেরিয়ে আসছে এমন কোন পরিস্থিতি অব্দি পৌঁছনোর আগেই তারা তাদের করা/না করা/চিন্তা করা সমস্ত দোষের কথা উগরে ফেলত।

একবার হয়েছে কি, কোন একটি অত্যন্ত গর্হিত অপরাধের কারণে একটি ছেলেকে তিনি ঘরে ডেকে পাঠিয়েছেন। এবার ঘরে জোর সওয়াল-জবাব চলছে। ছেলেটি এককাট্টা অস্বীকার করে যাচ্ছে যে তার ওপর যে কাজের অ্যালিগেশন, সেই কাজ সে করেনি। শেষ অব্দি, ওয়ার্ডেন সেই ওপরের ডাণ্ডাটা খুলে নিয়েছেন, এইবার লাঠ্যৌষধি পড়ল বলে। ডাণ্ডা দেখে ছেলেটির মনে হঠাৎ ভয় ঢুকেছে, এবং সে গড়গড় করে তার সমস্ত কুকীর্তির কথা কবুল করে ফেলেছে।

এতে হয়েছে কি, ওয়ার্ডেন একটু রিল্যাক্সড হয়েছেন, মারের আর প্রয়োজন নেই; তাই ছেলেটির কাছ থেকে আহরিত তথ্যাবলী ঠিক কি ভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে তিনি অভ্যাস মত আরামকেদারায় গা এলিয়ে দিয়েছেন।

আর যায় কোথায়? ওপরের ডাণ্ডা তো খোলা ছিল! শরীরের ওজন পড়তেই কাপড়টা ওপরের ফুটো থেকে বেরিয়ে এল, এবং ফলত, ওয়ার্ডেন ধড়াম করে ফ্রেম-টার মধ্যে পড়ে গেলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ভাঁজ হয়ে গেলেন এবং তাঁর ওপর ফ্রেমটাও দিব্যি ভাঁজ হয়ে গেল। এতক্ষণ ছেলেটি ভয়ে সিঁটিয়ে ছিল, হঠাৎ এ হেন চমকপ্রদ দৃশ্য দেখে সে যারপরনাই পুলকিত হয়ে হাঃহাঃ করে হেসে ফেলল। হাসি থামতে শোনে চিঁচিঁ করে ভেসে আসছে ওয়ার্ডেন-এর গলা, “ইরেঃ, হাসি থামাও, আমাকে তুলো, আমাকে তুলো!” সেখান থেকে শাঁ করে হাওয়া হয়ে যাবার প্রবল ইচ্ছে সংবরণ করে ছেলেটি ফ্রেম-এর ভাঁজ খুলে ওয়ার্ডেনকে টেনে তুলল।


যদিও ঘটনাটি আমাদের ব্যাচের নয়, এক বা দু’ক্লাস ওপরের ব্যাচের ঘটনা, তাও মারধোরের কথা মনে পরাতে মনটা একটু বিষাদখিন্ন হয়ে গেল। চলে যাবার আগে একটা অন্য ভাল গল্প বলে যাই। আমাদের প্রত্যেকটা ক্লাসে ছিল দুটো বাংলা মিডিয়াম সেকশন, এবং একটা ইংরেজী মিডিয়াম সেকশন। আমরা যারা ইংরেজী মিডিয়াম-এ পড়তাম, তাদের সবসময়ই একটু ঈর্ষা ছিল, কারণ বাংলা মিডিয়ামের ক্লাসগুলোতে যারা শিক্ষক ছিলেন তাঁদের ক্লাসগুলো খুব উপভোগ্য এবং মজার হোতো নাকি। ভাবছেন তো, নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস? ঠিক তা নয়। যেমন বাংলার শিক্ষক সুশান্তদার ক্লাসে উনি মাঝে মাঝে মজার মজার সব কাণ্ডকারখানা করতেন। একদিন ক্লাসে এসে বললেন, একটা এক্সারসাইজ করাবেন; উনি একটা লাইন বলবেন, এবং কারও একটা দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করবেন। তাকে পাঁচ সেকেণ্ডের মধ্যে অন্ত্যঃমিল সমেত পরের একটা লাইন বলতে হবে।

সুশান্তদা বললেন,
“কি সুন্দর চাঁদ, আর কি সুন্দর রাতি!” বলে তর্জনী চালনা করলেন সেই সেকশনের টপারদের মধ্যে একজনের দিকে, ধরা যাক তার নাম দেবনারায়ণ। লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দেবনারায়ণের ঝটিতি উত্তর,
“হুশ করে উড়ে গেল এক ঝাঁক হাতি!”

কোথায় লাগে “দ্য কাউ হুইচ জাম্পড ওভার দি মুন”! জ্যোৎস্নামাখা মায়াময় রাত্রে উড়ন্ত গজকূলের মনোরম চিত্র কল্পনা করে সেদিন ক্লাসের সবাই বেদম হেসেছিল।

Advertisements

7 thoughts on “আরামকেদারায় বসে দুই পা নাচাই রে…

  1. আমার ঘ্যাম লেগেছে পড়তে। কবিতাটা জাস্ট অসাধারণ। কিন্তু আরো ছবি থাকলে ভাল হত।

    আর, ‘ইস্ক্রুপ’ কথাটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য শতকোটি ধন্যবাদ।

    • ভাল ভাল কথা বলার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আর ছবি পাব কই? নাটকের কুশীলব বলতে তো এক ওয়ার্ডেন, একটা ইজি-চেয়ার, আর একটা ছেলে – ছেলেটাকে কল্পনা করে নিলেই হয়, নাকি? 😀

  2. ******দার ছবিটা কিন্তু দারুণ হয়েছে।
    (সম্পাদনাঃ আসল নামটা ঢেকে দিলাম। আসল নাম এক্ষেত্রে না ব্যবহার করাই বাঞ্ছনীয়।)

কেমন লাগল? লিখে ফেলুন!

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s