ফুচকার আখ্যান

এরম করলে খেলবনা। জানি কুন্তলা ভাল লেখে, দুর্দান্ত লেখে; জানি তার অসাধারণ পর্যবেক্ষণ শক্তি এবং বর্ণনার ক্ষমতা, তার কলম থুড়ি কীবোর্ড-এ সাক্ষাৎ সরস্বতীর অধিষ্ঠান। কিন্তু তাই বলে ফুচকা নিয়ে এমন লিখবে, এত মনোগ্রাহী একটা লেখা? প্রচণ্ড হীনমন্যতায় ভুগে ভুগে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেলাম প্রথমে। তারপরই অবশ্য সম্বিত ফিরল, বলা যায় – ছাই থেকে ফিনিক্স-পাখির মত বেরিয়ে এলাম, ডান কাঁধের দেবদূত বাঁ কাঁধের হিংসুটে শয়তানকে একটা সাধারণ প্রশ্ন করল, যখন নবনীতা দেবসেন-এর লেখা পড়ি, তখন কি হিংসা হয় আদৌ – নাকি অনাবিল আনন্দে শুধু উপভোগই করি ওনার লেখনীমাধুর্য? ব্যস! সব পারুষ্য অচিরেই উধাও হয়ে গেল, রয়ে গেল একটা চমৎকার লেখা পড়ে ওঠার আবেশ। ওঃ, আমি আগে কখনও বলিনি? কুন্তলার লেখায় আমি নবনীতাদিদির ছায়া পাই যে!

প্রথমেই ডিসক্লেমার, ফুচকা জিনিষটা আমার কিন্তু খেতে হেব্বি লাগে। (দুঃখিত, সোমনাথ!) ওই ছোট্ট লুচির মত টোপলা জিনিষটা, তার মধ্যে ঝালঝাল পুর ভরা, আর ওই টক টক জলটা, পুরোটা মুখে পুরে দিলেই একটা স্বাদের বিস্ফোরণ – এবং অপেক্ষা করার কোন সময় নেই, ফুচকার সংখ্যা দামের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত, এবং শালপাতার বাটিতে অবধারিতভাবে ফুটো থাকবে, সুতরাং একটা নির্দিষ্ট দ্রুতগতির সঙ্গে এক একটা ফুচকাকে মুখগহ্বরে চালান না করলেই সেই জল নিম্নগতিপ্রাপ্ত হবে বাটি থেকে আঙ্গুল বেয়ে হাতা হয়ে মাটিতে। জলীয় পদার্থে যেহেতু পাঁচ সেকেন্ডের নিয়ম খাটেনা, তাই সেই অনবধানতাবশত জলবিয়োগ যে কি ক্ষতি, সেটা যে ফুচকা-সেবন না করেছে তার পক্ষে অনুধাবন করাটা নিতান্তই অসম্ভব।

ফুচকাওয়ালার বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের চাপে ফুচকার ওপরাংশে ছিদ্রসৃষ্টি থেকে সুরু ফুচকার যাত্রা, ডান হাতের আঙ্গুলের তড়িদ্গতি সক্রিয়তায় সেই ছিদ্রাভ্যন্তরে পুর প্রেরণ, পুর সমেত ফুচকার অম্লসলিলে অবগাহন – যেমনটি কাশীতে বিশ্বনাথের মন্দির দর্শনের আগে পুণ্যার্থীরা পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গায় করে থাকেন – এবং শালপাতা বাহিত হয়ে ফুচকার খাদ্যনালীর অন্তরালে অন্তর্ধান, বেশ একটা জীবনের মেটাফর-এর মত। ওই যেমন মহাজ্ঞানী স্বামী চন্দ্রিল বলে গেছেন, সকলি ফুরায় ফুচকার প্রায়, পড়ে থাকে শালপাতা।

আমার এই ফুচকাপ্রীতি ঠিক কোথা থেকে এল জানিনা। এমন নয় যে আমি দেদার ফুচকা খেয়েখেয়ে বড় হয়েছি। কিছুটা জিনগত কারণ অবশ্য থাকতে পারে, কারণে মামার বাড়িতে আমার মা-এর ফুচকাপ্রেম-এর কথা বেশ প্রাচীন অরণ্য প্রবাদের মতনই ছিল। মা-র কাছে অল্পবিস্তর শুনেছি, খুব বেশি না – কারণ গলব্লাডার অপারেশন-এর পরে ডাক্তারের নিষেধক্রমে মা-কে ফুচকা পরিত্যাগ করতে হয়, সেটা মা-র বিশাল দুঃখদায়ী একটা ঘটনা। তবে একটা ব্যাপারে মা-র সঙ্গে আমি একমত ছিলাম, ফুচকা জিনিষটা ওই ফুচকাওয়ালার কাছেই খেতে হয়, বন্যেরা বনে সুন্দর। মা-র খুল্লতাত মহোদয় বাড়ির মেয়েকে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ফুচকা-সেবনের ব্যবস্থা করে দেবার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেছিলেন বাড়িতে ফুচকা বানিয়ে দেবার, সেই একই রকম ফুলকো মোড়কটা, একই রকম আলু, মটরশুঁটি এবং মশলা দিয়ে পুর, এবং তিন্তিড়ি-প্রয়োগে অম্লকষায়িত ধনেপাতা বর্ষিত জল। কিন্তু সেটা দেখতে যতই একইরকম হোক না কেন, মুখে দিয়ে কখনোই সেই স্বর্গীয় অনুভূতির সৃষ্টি করে না। “করে না” বলছি কারণ আমিও একবার সেই বাড়িতে তৈরী ফুচকা খেয়ে দেখেছি। তারপর প্রতিজ্ঞা করেছি, না খেতে পাই, না খাই, তবু বাড়িতে তৈরী ফুচকা খাবনা। বহু বছর বাদে বিদেশে এসে প্যাটেল ব্রাদার্স-এর গ্রোসারী স্টোরে হলদিরাম-এর তৈরী প্যাকেট-এর ফুচকা দেখে মতিবিভ্রম হয়েছিল, কিনে নিয়েছিলাম। সুযোগ্যা সহধর্মিণী যত্নসহকারে তেঁতুলের জল-ও তৈরী করে দিয়েছিলেন। কিন্তু হায়! বাড়িতে তৈরী ফুচকায় অন্তত আপনজনের আদরটুকু থাকে, প্যাকেট-এর ফুচকা তো স্বাদে, গন্ধে, অনাদরে অতি জঘন্যবিশেষ।

কুন্তলার মত খানদানী ফুচকা-কি-শওকিন না হওয়ার দরুন আমার ঠিক কোন ফিক্সড ফুচকাওয়ালা ছিলনা, কিন্তু আমার কয়েকটা পছন্দের ফুচকার ঠেক ছিল, যেমন বালিগঞ্জ স্টেশন রোড-এর ওপর একজন, নিউ এম্পায়ার আর লাইট-হাউসের মধ্যের গলির একজন, আর দিল্লীর চিত্তরঞ্জন পার্ক কালীবাড়ির উল্টোদিকে বাজারের এক পাশে একজন। এগারো বছর দেশ ছেড়েছি, তারা আর আদৌ ইহজগতে আছে কিনা জানিনা।

ফুচকাওয়ালার হাতে তৈরী ফুচকায় ঠিক কেন যে ওই রকম মনপ্রাণমাতানো স্বাদ হয়, সেটা আজও রহস্য অবশ্য। কুন্তলাও জানে কিনা জানিনা। সেই রহস্য কি কোনওদিন উদ্ঘাটিত হবে? স্কুলের দরজার পাশে, পাড়ার মোড়ে, ময়দানের পথে দাঁড়ানো লাল-নীল আইসক্রিম বিক্রীর লোকজন ধীরে ধীরে মুছে গিয়েছে। ফুচকারও কি সেই হাল হবে? ফুচকাওলার ফুচকার স্বাদমাহাত্ম্য কি আগামী প্রজন্মের অধরাই থেকে যাবে?

স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়ায় তৈরী ফুচকায় অবশ্যই কয়েকটা প্রয়োজনীয় উপকরণ অনুপস্থিত থাকে। ঘর্মাক্ত কপালে তর্জনীটাকে গাড়ির কাচে ওয়াইপারের মত চালিয়ে ঘাম ঝরিয়ে গামছায় হাত মুছে কি না মুছে সেই হাতেই ফুচকা বানাতে দেখেছি। শীতের দিনে ফোঁৎ করে তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুলের ফাঁকে নাক ঝেড়ে সেই হাতে পুরটা মাখতে দেখেছি। বৈষ্ণবঘাটায় আমাদের বাড়ির ঠিক উলটো দিকে একটা ফুচকাওয়ালার বস্তি ছিল। আমাদের জানলা দিয়ে পাঁচিলের ওপারে তাদের দিব্যি দেখা যেত। কচুরীপানা ভরা একটা পুকুরে, যাতে কিনা হাঁস চড়ত, বাচ্চাগুলো ডুব দিয়ে চান এবং — ইয়ে, মানে ওগুলোও — করত, সেই জলই তারা বাটিতে তুলে ফুচকার পুর মাখা বা টক জলটা বানানোর কাজে ব্যবহার নির্দ্বিধায়। অবশ্য এতদসত্ত্বেও কোনদিন যখন ওই অঞ্চলে কোন মেজর পাব্লিক হেলথ ইমার্জেন্সী বা ডিসাস্টার-এর কথা শুনিনি, তখন সন্দেহ করার আমি কে?

উৎস বা উপাদান যাই হোক না কেন, ফুচকার উৎপাদনপ্রণালী নিঃসন্দেহে একটা আর্টবিশেষ। সেই শিল্পের রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন কিনা? ফুচকার একটা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন কিনা, আপনারাই বলুন?

Advertisements

6 thoughts on “ফুচকার আখ্যান

  1. আমার সঙ্গে ফুচকার সম্পর্ক অনেকদিনের। আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, বিবেকানন্দ পার্কের সংলগ্ন ফুচকাওলা আমার পছন্দের তালিকায় এক নম্বর।

    আমার জীবনের এককালীন রেকর্ড চুয়াত্তরটা ফুচকা। আমি আর কখনও ষাট ছাড়াতে পারিনি – তার আগেও না, পরেও না।

    তবে আমি কুন্তলা বা তোমার মত অত অপরিসীম ভালবাসি না। তবে ঘুগনি হলে ব্যাপারটা অন্যরকম। গড়িয়াহাট মোড়ের সেই ঘুগনিওলা আমাকে চেনে, আর নিঃসঙ্কোচে “অওর এক দূঁ?” জিজ্ঞেস করে। এক বাটি, দু’বাটি, তিন বাটি, চার বাটি…

  2. Kanna pachhe, ami phuchka boddo bhalobashi. Kausik Da – tumi amader bari te Mamir (hNya, shei Mami) toiri phuchka jodi khai, fan hoye jabe. Shotti.

    Ar amar biyer din Thyagraj Hall e jawar aage, ar shob onushthan hoye toye jawar por ami only phuchka kheyechilam. Aage 4 te, pore bodhay 8 ta. Bibekananda Park er gop-ola-dada ke biyebari te phuchka supply korte niye asha hoyechilo. Shonge churmur o chilo.

  3. আহা, সেই ছেলেবেলার গল্প করার দিনগুলি ভেসে উঠল। ১৯৬৭ বা ৬৮ সাল। হাজরা রোডে archaeology building থেকে পিছন দিকে science collegeএ যেতে হত সপ্তাহে দুদিন – সোম আর মঙ্গলবার। যেই না রাস্তায় নামা, ফুচ্‌কাওয়ালাটা একদম রেডি হয়ে থাকত। ও দাদাদিদিরা, বউনিটা করে দিয়ে যাননা — এবম্বিধ সাদর আহ্বানকে উপেক্ষা করার শক্তি সচরাচর কারোরই ছিল না, আমরা তো ছাপোষা দশটি বঙ্গসন্তান। হাতের ঘড়ির আপত্তি সত্ত্বেও দশটা মাথা গোল হয়ে ঘিরে ধরল রোগা টিংটিঙে ছাপরাবাসীকে। দশ পয়সায় চারটে বোম্বাই গোল্লা, কষ্ট করে মুখে ঢোকাতেহয়। তাও নানা বায়না সহযোগে মুহুর্তে উধাও করে দে দৌড়, দে দৌড়।এর বেশি সময়ও নেই, পয়সাও নেই। দেরি হলে স্যার ক্লাসে ঢুকতে দেবেন না। হায়, সোনালি সেই দিনগুলি কোথায় যে ভেসে গেছে।

কেমন লাগল? লিখে ফেলুন!

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s