শাখামৃগোপাখ্যান

ক’দিন পূর্বে আমার বন্ধু মধুবন্তীর মুখপুস্তিকার পাতায় একটি মজার ছবির দর্শন মিলিয়াছিল – একটি ঘুমন্ত বাঁদর। চার-হস্ত-পদ একত্রিত করিয়া, খুব সম্ভবত নাসিকাভ্যন্তরে সর্ষপতৈল নিক্ষেপপূর্বক সে পরম শান্তিতে দিবানিদ্রায় নিমগ্ন – এমতাবস্থায় কোন উৎসাহী প্রকৃতিপ্রেমী চিত্রগ্রাহক/গ্রাহিকা তাহাকে ক্যামেরাবন্দী করিয়া ফেলে।

Source Unknown: tired monkey

দুঃখের বিষয় এই যে, অন্তর্জালজগৎ আমি পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান করিয়াও এই ছবিটির উৎস আবিষ্কারে ব্যর্থ হইয়াছি। এই তথ্য কাহারো জ্ঞানগোচর হইলে আমাকে অবহিত করিবেন এই প্রার্থনা রাখি। যাহা হউক, এই নিদ্রালিপ্ত শাখামৃগপ্রবরকে অবলোকনমাত্রই আমার স্মৃতিপটে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল শিশুকালের হনুমান-কাহিনী, আমার মাতামহীর পরিবারের রোমহর্ষক ঘটনা। উক্ত ঘটনাসমূহে অবশ্যই এহেন নিমীলিত-নয়ন বাঁদর নাই, বরঞ্চ আছে করালদংষ্ট্রাবিকশিত শমনবরণ হনুমান।

Image courtesy of domdeen / Freedigitalphotos.net
Image courtesy of domdeen / FreeDigitalPhotos.net

শৈশবে শ্রুত কাহিনী, কিঞ্চিতপরিমাণে বিস্মৃতি ঘটিয়াছে এমনটি আশংকা করিয়া মদীয় জননীর দ্বারস্থ হইয়াছিলাম; প্রচণ্ড উৎসাহভরে মাতৃদেবী কাহিনী ফাঁদিয়া বসিলেন। তাঁহার কথনগুণে সেই সব ঘটনা পুনরায় উজ্জীবিত হইয়া উঠিল, এবং আমার উপলব্ধি ঘটিল যে উক্ত গল্প পরিবেশন-এর দায়িত্ব মাতৃদেবীর স্কন্ধেই ন্যস্ত করা উচিত। অতএব, আমি স্বেচ্ছায় অপসারিত হইলাম, এবার সঞ্জয় জননী উবাচ।

এই গল্পটা আমার মায়ের ছোটবেলার কথা। অনেক বছর আগের গল্প এগুলি। হনুমানের গল্প।

মা-দের ছেলেবেলা কেটেছিল ঢাকার উয়ারি পাড়ায়। তখনও দেশ ভাগের স্বপ্ন কারো মনের কোণাতেও নেই। বেশ বড় জায়গা নিয়ে আমার দাদুর দোতলা বাড়ি। চারপাশে অনেক বড় বড় গাছ-গাছালি রয়েছে। এরকম আরো বাড়ি আছে। আর আছে হনুমানের দল। বড় মেজো সেজো, পুঁচ্‌কি ধুমসো, মেয়ে মদ্দ মিলিয়ে প্রচুর হনুমানের মৌরসি পাট্টা গাড়ানো পাড়া সেটা। গাছে গাছে অবাধ বিহার, কোন একটা বাড়ির ছাদে নৈমিত্তিক সভা, খাওয়া, ঘুম, বিকাল হতেই ছাদের রেলিংএ বা খোলা কার্নিশের উপর সারি সারি লেজ লম্বমান করে বৈকালিক শোভা দর্শন বা মন্দ মধুর সমীরণ উপভোগ – এ ছিল তাদের নিত্যকর্ম। এছাড়াও আরো কিছু ছিল।

সকাল হয়েছে। সকলেই নিত্যকর্মে ব্যস্ত হয়েছে। দাদু প্রাতরাশ সেরে অফিস চলে গেলেন। মা-রা স্কুল যাবার জন্য যে যার স্নানের ঘরে ঢুকেছে। কাজের মহিলারা শোবার ঘরের বিছানাগুলি পরিপাটি করে গুছিয়ে ঘর পরিষ্কার করে নিচে চলে গেল। একটু পরে ছেলেমেয়েরাও খেয়েদেয়ে যে যার স্কুলে চলে গেল। দোতলাটা শুন্‌শান হয়ে গেল। দিদিমারা নিচ তলায় রান্না ও গল্পে ব্যস্ত। সেই তারা তো তক্কে তক্কে ছিল। এপাশ ওপাশ থেকে ঝুপ ঝুপ করে কয়েকজন শোবার ঘরের লাগোয়া বারান্দায় অবতীর্ণ হল। বন্ধ দরজা একটু ঠেলল। মালতীমাসি হয়তো একটু কম সতর্ক ছিলেন সেদিন। দরজায় তালা দিতে ভুলে গেছেন।

ব্যস্‌, আর পায় কে — হনুমান-বাহিনী একেবারে দাশরথিসেবক হনুমানের মতই বীরদর্পে ঘরে ঢুকে পড়ল। আঃ, কি সুন্দর নরম বিছানা! দু’তিনজন কিচ্‌কিচ্‌ করে সটান ডাইভ। বিছানা লন্ডভন্ড করে তারা শয্যাসুখ উপভোগ করতে লাগল। আর বাকিরা? ড্রেসিং টেবিলের সামনে একটা বড়সড় ভীড়। কেউ টেবিলে বসে, কেউ অন্যজনকে ধাক্কা দিয়ে, কেউবা এর তার পিঠে চড়ে দর্পণে মুখশশী নেহারিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কী মুখ ভ্যাংচানোর ধূম। কতক্ষণ যে কেটে গেল কারো খেয়াল নেই।

সহসা রসভঙ্গ। দিদিমা হয়তো কাউকে কোন কাজে উপরে পাঠিয়েছেন। সে এসে ঘরে ঢুকেই চিল চীৎকার। “ও মাগো, শিগ্‌গির এসো, হনুমানের কান্ড দেখো। হায়, হায়, খানিক আগে ঘর পরিষ্কার করে গেলুম, কি হাল হয়েছে বিছানার।” দিদিমা আসতে আসতে হনুমানের দল নিতান্ত অনিচ্ছায় বিরক্তিসহকারে উধাও।

Advertisements

3 thoughts on “শাখামৃগোপাখ্যান

  1. বাঁদরের গল্প প্রায় ভূত, চোর আর প্রেমের গল্পের মতোই মহার্ঘ। তার ওপরে সে গল্প তুমি আর তোমার মা দুজনে মিলে এত সুন্দর করে বললে তো আর কথাই নেই। খুব ভালো লাগল।

  2. পিংব্যাকঃ হনুমানের প্রতিশোধ | haw-jaw-baw-raw-law, or হ-য-ব-র-ল

কেমন লাগল? লিখে ফেলুন!

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s