হনুমানের প্রতিশোধ

আগের দিন শাখামৃগোপাখ্যান লিখতে গিয়ে মা-এর সঙ্গে বাঁদরের বাঁদরামি নিয়ে অনেক গল্প হয়েছিল। তাতেই ধীরে ধীরে জানতে পারলাম যে উক্ত প্রাণীকূলের সঙ্গে আমাদের বেশ খানদানী সম্পর্ক – তাই বেশ কয়েকটি রোমহর্ষক কাহিনী থলের ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়লো। সেই ঘটনাসমূহ সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে না পারলে আমার ঠিক প্রাণে শান্তি হচ্ছে না। অতএব, সাধু সাবধান… এই ঝুলি নড়ছে, এ-এ-ই ঝুলি নড়ছে…

সেই ঢাকার উয়ারি পাড়ার বাসাতেই বড়ো হওয়া আমার দিদিমার ভাই, আমার মা-এর মামা; সেই ভদ্রলোককে আমিও তাঁর কলকাতার বাড়িতে দেখেছি, অনেক পরে, এবং যে কোন কারণেই হোক, ভদ্রলোকের একটা অত্যন্ত রাশভারী, রোষকষায়িতনেত্র-সমণ্বিত ছবি আমার মাথায় বসে গেছে। সুতরাং – যদিও তিনি বহুকাল আগেই গত হয়েছেন – মা-এ কাছে যখন ওনার গল্প শুনলাম, সেই সব দিনগুলোর কথা কল্পনা করে নিতে বিন্দুমাত্র কোন অসুবিধা হল না। আগের বারের মতই, মা-র ভাষণেই তুলে দিলাম পুরো গল্পটা।

এই হনুমানের দলের উপর আমার মামার প্রায় জাতক্রোধ ছিল। ছোটোবেলা থেকে হনুমানের সঙ্গে ওঠাবসা তো? স্বভাবে অনেক হানুমানিক চপলতা ঢুকে গিয়েছিল। মামা এবং হনুমানদের মধ্যে বেশ একটা চিরবৈরিতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রত্যেকেই একে অন্যের পিছনে লাগবার সুযোগের অপব্যবহার করত না। মানুষ হিসেবে মামার সুবিধা ছিল বেশি। সঙ্গে সবসময় কেউ না কেউ রয়েছে। তবে হনুমানেরাও কম যায় না। চকিতে গায়ে একটা খামচি বা একটু মুখ খিঁচিয়ে দেয়া – এসব চলতেই থাকত।

একদিন বিকালবেলা মামা বন্ধুদের সঙ্গে সান্ধ্য আড্ডার জন্য ছাদে উঠছে। দেখতে পেল একটা গোদা হনুমান লেজ ঝুলিয়ে রাস্তার দিকে মুখ করে বসে আছে। পিছন থেকে ছুরি মারার মত আমোদ যে কত উপভোগ্য তা মানুষ ছাড়া আর কেই বা জানে? এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। মামা চুপি চুপি পিছন থেকে লাগাল এক রামধাক্কা। কেন যে হনুমানটা এত অন্যমনস্ক হয়েছিল, জানবার উপায় তো নেই, কিন্তু অপ্রস্তুত অবস্থায় সে সত্যিই হুড়মুড় করে পড়ে যেতে যেতে কোন রকমে একটা গাছ ধরে সামলে পালাল। পেছনে তখন সবান্ধবে মামার উল্লাস অট্টহাস্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

টীকাঃ ভাগ্যিস, সেই সময় আমি জন্মাইনি! এই রকম কিনা কারণে অযথা পশুপাখিকে ব্যথা দেওয়া বা যন্ত্রণা করাটা আমার ঘোর আপত্তিজনক লাগে। মামা ভদ্রলোককে দু’এক কথা শুনিয়ে দিতে আমার আটকাতো না। গজগজগজগজগজ… যাকগে। গল্পে ফিরে আসি।

কিন্তু চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়। এক গ্রীষ্মের দুপুরে মামার এল বিয়োগ-বেগ। আজকের ভাষায় বড় বাথরুম তখনকার দিনে ঘরের সঙ্গে লাগোয়া হত না। এক কাঁঠাল গাছের তলায় বাথরুমটা ভর দুপুরের রোদ্দুরে শুক্‌নো খট্‌খটে হয়ে কেমন যেন ওমের অনুভূতি ছড়াচ্ছে। মামার বাড়ির কাজের লোকেরা খাওয়া দাওয়া সেরে ভাতঘুমে আচ্ছন্ন। একলা মামা একটা বই হাতে বাথরুমে ঢুকল। বাথরুমে বসে নাকি গল্পের বইয়ের মগ্নতাটা বেশি হয়। মগ্নতার ঠ্যালায় মামা টেরই পেল না যে বাথরুমের দরজাটা খুলে গেছে, আর নিঃশব্দে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যমদূতের মত সেই গোদা হনুমানটা। হঠাৎ এক থাপ্পড়ে বইটা উল্টে যেতেই মামার চক্ষু চড়কগাছ। সেই অবস্থাতেই এক অসম হাতাহাতি ও আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে করতে মামা চীৎকার করে ডাকতে লাগল সবাইকে। লাঠিসোটা হাতে হৈ হৈ করে সহায়কদের এসে পড়ার ফাঁকে এক থাপ্পড় ও ভেংচি উপহার দিয়ে হনুমান পগার পার।

টীকাঃ আমার মতে, এতক্ষণের কাহিনীতে এই জায়গাটাই সবচেয়ে মজার এবং আনন্দদায়ক। চাক্ষুষ দেখার তো সৌভাগ্য হয়নি, তবু মনশ্চক্ষে দৃশ্যটা ভেসে উঠতেই পরম পুলকিত হচ্ছি।

Advertisements

কেমন লাগল? লিখে ফেলুন!

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s