লান সু ইউয়ান চৈনিক উদ্যান – প্রথম কিস্তি

নর্থওয়েস্ট থার্ড অ্যাভেনিউ এবং এভারেট স্ট্রীট-এর সংযোগস্থলে অবস্থিত পোর্টল্যাণ্ড-এর ক্লাসিকাল চৈনিক উদ্যান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরপশ্চিমের ওরেগন রাজ্যের শহর পোর্টল্যাণ্ড এবং তার ‘সহোদরা শহর’ চীনদেশের জিয়াংসু অঞ্চলস্থিত সুজৌ – এই দুই শহরের পারস্পরিক সহযোগিতায় তৈরী এই মনোরম প্রতিষ্ঠানটি।

সুজৌ শহর, যার গোড়াপত্তন হয় ৫১৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে, সেদেশের সর্বপ্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। পূর্ব উপকূলবর্তী সাংহাই-এর ৬০ মাইল পশ্চিমের শহর সুজৌ, পোর্টল্যাণ্ড-এর মতনই তার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। ১০০০ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ সুজৌ খ্যাতিলাভ করে তার বাণিজ্যভিত্তিক বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির জন্য, ফলে সেটি অনেক সরকারী পদে আসীন শিল্পীর আবাসস্থল হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরণের অনেক পদাধিকারী-শিল্পীর বাড়ির অভ্যন্তরে একটি করে সুন্দর বাগান তৈরী করা হোতো; উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতির স্পর্শ একটুকরো বাঁচিয়ে রাখা, অনেকটা যেন প্রখ্যাত চৈনিক ল্যাণ্ডস্কেপ পেইন্টিং-এর প্রাণবন্ত বহিঃপ্রকাশ। ধ্যান-মনন, কাব্যসৃষ্টি বা চিত্রকারী, উদ্যানবিদ্যার চর্চা, বা নিছক বন্ধু বা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার জন্য আদর্শ জায়গা ছিল এই বাগানগুলো।

১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে শিলান্যাস হয় ‘লান সু ইউয়ান’ নামে পোর্টল্যাণ্ড-এর চৈনিক উদ্যানের। মিং সাম্রাজ্যের সময়কার (১৩৬৮-১৬৪৪ খ্রীষ্টাব্দ) বাগানের আদলে লান সু ইউয়ান-এর পরিকল্পনা করেন সুজৌ-এর স্থপতি-ডিজ়াইনার-রা; সেই সময়ের ঐতিহ্যের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন নকশা, পদ্ধতি এবং মালমশলার ব্যবহার নির্দিষ্ট করা হয়। নির্মাণকাজে যোগদানের জন্য সুজৌ থেকে আগত ষাট-এর অধিক শিল্পী পোর্টল্যাণ্ড-এ থাকতে শুরু করে; চীনদেশ থেকে আমদানী করা হয় সামগ্রী এবং যন্ত্রপাতি, যেমন ছাদ এবং মেঝের টাইল, হাতে তৈরী কাঠের আসবাবপত্র, জাফরী-কাটা জানলা বা ঝরোকা, এবং ৫০০ টন ওজনের গ্র্যানাইট এবং মহার্ঘ্য ‘তাই হু’ প্রস্তরখণ্ড; এমনকি, নকশী উঠান এবং পায়ে চলার পথ তৈরীতে ব্যবহৃত রঙীন নুড়িও। এই সব দিয়ে তৈরী হয় বাইরের আর ভিতরের দেওয়ালগুলি, একটি প্রাসাদোপম দোতলা বাড়ি, একতলা কিছু বাড়ি, জায়গায় জায়গায় কয়েকটি মণ্ডপের মত, এবং রাস্তা। প্রায় ১২৮ লক্ষ মার্কিন ডলার ব্যয়ে গঠিত এই উদ্যান জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।

Plaque

বড়রাস্তা থেকে প্রবেশের পথ হল উদ্যানের দক্ষিণপ্রান্তের একটা পাথরের দরজা; চীনদেশে আনুষ্ঠানিক প্রবেশপথ সবসময়েই দক্ষিণে রাখা হয়। রাস্তার দিকে মুখ করা অংশে খোদাই করে লেখা আছে “প্রকৃতির সমস্ত বৈচিত্র্য ধরা হয়েছে এই অলাবু-স্বর্গে” (এই লাউ-এর সঙ্গে আবদ্ধ জায়গার তুলনাটা চীনদেশে খুব প্রচলিত); অন্তর্মুখী অংশে লেখা আছে “সরোবর ও পর্বতের মাঝে অবস্থিত আসল অর্থ”; এই “প্রকৃতির ধ্যানে সত্যের উদ্ঘাটন” থীম লান সু ইউয়ান-এ বারংবার দেখা যায়।

Main Entry gate

নিছক একটা গাছপালা-সম্বলিত বাগানের থেকে অনেক বেশী, লান সু ইউয়ান একটি কারিগরী বিস্ময় – দু’হাজার বছরের পুরোনো চৈনিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে প্রগাঢ় অনুপ্রেরণা যোগান একটি অভিজ্ঞতা, যেখানে শিল্পকলা, স্থাপত্যবিদ্যা, ডিজ়াইন এবং প্রকৃতি নিখুঁত ঐকতানে মিশেছে।

এধরণের চিরায়ত চৈনিক উদ্যানে সাধারণত পাঁচটা মৌলিক ধারণার সমাহার দেখা যায়ঃ উদ্ভিদ, পাথর, জল, স্থাপত্য, এবং কবিতা। শতাধিক উদ্ভিদ প্রজাতি-সম্বলিত পোর্টল্যাণ্ড-এর লান সু ইউয়ান-এর গাছের সংগ্রহ দুর্দান্ত, যার প্রায় ৯০ শতাংশ গাছের উৎপত্তি চীনদেশে। এখানে আছে পঞ্চাশের বেশী গাছের নমুনা, প্রচুর দুষ্প্রাপ্য এবং বিশিষ্ট গুল্ম আর বর্ষজীবী ধরণের উদ্ভিদ, এবং ম্যাগনোলিয়া, পিওনি, ক্যামেলিয়া, রোডোডেন্ড্রন, সিম্বিডিয়াম (একধরণের অর্কিড), ওস্‌ম্যান্থাস এবং বাঁশ। এদের অনেকেরই চৈনিক উদ্যানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, আবার কিছু কিছু চীনদেশের পশ্চাৎপ্রদেশে সাম্প্রতিক অভিযানের ফসল – এমন প্রজাতি যা পশ্চিমী দুনিয়ায় এযাবৎ অজ্ঞাত ছিল। নিচে কয়েকটি নমুনাঃ

Some Land plants

Some Water plants

আসুন, একটু ঘুরে দেখা যাক, নাকি? এগোলেই পূর্বদিকে মূল উদ্যানে ঢোকার দরজা, পরিমিত, ছিমছাম তার গঠন। ওপরে তিনটি চৈনিক অক্ষর, ডান থেকে বাঁদিকে পড়তে হয়, লেখা আছে “লান সু ইউয়ান”; লান অর্থাৎ অর্কিড, সু অর্থাৎ উন্মেষ বা জাগিয়ে তোলা, ইউয়ান অর্থাৎ উদ্যান (বাগানের তাই কাব্যিক নাম হোলো, “উন্মেষিত অর্কিড-এর উদ্যান”)।

Lansuyuan Entrance

চলুন, এগিয়ে যাই। [দ্বিতীয় কিস্তি]

Advertisements

One thought on “লান সু ইউয়ান চৈনিক উদ্যান – প্রথম কিস্তি

  1. পিংব্যাকঃ লান সু ইউয়ান চৈনিক উদ্যান – দ্বিতীয় কিস্তি | haw-jaw-baw-raw-law, or হ-য-ব-র-ল

কেমন লাগল? লিখে ফেলুন!

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s