লান সু ইউয়ান চৈনিক উদ্যান – দ্বিতীয় কিস্তি

লান সু ইউয়ান-এ ঢুকে পড়েছেন তো? এবার এখানেই চারপাশটা একটু নজর করে দেখা যাক।

দরজা পার হলেই প্রথমে ‘প্রশান্তির অঙ্গন’ বা কোর্টইয়ার্ড অফ ট্র্যাংকুইলিটি; এক কোণায় বিশাল একটি ওস্‌ম্যানথাস গাছ, প্রতি নভেম্বর-এ তার ফুল আসে এবং গন্ধে তার চারিপাশ ম ম করে। প্রবেশপথের উত্তরপ্রান্তে – এবং কমবেশী সমস্ত বাগানেই জায়গায় জায়গায় ছড়ানো – এক চিলতে করে মাটির জায়গা, চারপাশটা ঘেরা, তাতে তিনটে করে গাছ পোঁতা আছে; পাইন, প্লাম, এবং বাঁশ। এদেরকে একসাথে বলা হয় “শীতের তিন বন্ধু”, এবং চৈনিক চিত্রকলা, কারুশিল্প, কবিতা এবং অন্যান্য শিল্পকলাতে প্রায়শই এরা একত্রে উপস্থাপিত হয়। মাটির জমির ঠিক মধ্যেখানে একটা অর্দ্ধেক মেঘের মত দেখতে তাই হু পাথর, তার নাম “অর্দ্ধচন্দ্রাকৃতি মেঘ”, তার প্রতীকি অর্থ হলো অন্য অর্দ্ধাংশ সুজৌ-তে রয়েছে।

Courtyard of Tranquility - layers - Tai Hu stone
ওপরঃ বাঁয়ে – অঙ্গন; ডাইনে – তাই হু; নিচেঃ প্রস্থানপথে দৃশ্যস্তরের নমুনা

তাই হু বা তাই সরোবর প্রস্তর – এই চুনাপাথরের চাঁই পাওয়া যায় সুজৌ-এর তাই সরোবরের কিনারে, যেখানে জলের প্রতিঘাতে ধীরে ধীরে তারা তাদের চমকপ্রদ আকার ধারণ করে – ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি, রুক্ষ জমি, এবং ছিদ্রসম্বলিত। এর ফলে তাদের সঠিক ওজন আন্দাজ করা মুশকিল। লান সু ইউয়ান ধরণের বাগানে হু প্রস্তরকে অনেক সময় পাহাড়ের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়; চৈনিক ভূচিত্র – যার আদলে লান সু ইউয়ান-এর নকশা তৈরী হয় – তার নাম ‘শান শুই’ অর্থাৎ ‘পর্বত ও জল’, এবং সে কারণে শিল্পীদের বাগানে এই হু প্রস্তরের উপস্থিতি অতি আবশ্যিক।

প্রশান্তির অঙ্গনে দাঁড়িয়ে গোলাকৃতি প্রস্থানপথের দিকে তাকালে লান সু ইউয়ান-এর একটা বিশেষ চারিত্রিক অনন্যতা চোখে পড়ে। এই ধরণের বাগানগুলি যে সব শহরে বানানো হোতো, সেখানে জমিজায়গা অঢেল ছিল না। পোর্টল্যাণ্ড-এর উদ্যানটিও শহরের একটি ব্লক, বা মাত্র চল্লিশ হাজার বর্গফুট অঞ্চল জুড়ে। স্থপতি-শিল্পীদের কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল কি করে জায়গার বিভ্রম সৃষ্টি করা যায়, সীমিত স্থানেই কি করে অসীমের আভাস দেওয়া যায়। এর কারিগরী কৌশলটা খুব সুন্দর; বাগানের বিভিন্ন বিশিষ্ট উপাদান এমন ভাবে সাজানো হয়, যাতে পুরো বাগানটা একসাথে এক জায়গায় দৃশ্যমান না হয়। যে কোন জায়গা থেকেই হোক না কেন, কৌশলগতভাবে দৃষ্টিপথে বাধার সৃষ্টি করা হয়, যাতে গাছ এবং অন্যান্য অবয়ব সর্বদাই বিভিন্ন স্তরে প্রকট হয়। কিন্তু সেই আপাতবাধার মধ্যে মধ্যেই আবার সুন্দর বাঁধানো নকশী আঁকা দরজা ফোটানো রয়েছে এক স্তর থেকে অন্যত্র সঞ্চারের জন্য, যার ফলে কখনোই আবদ্ধ বা দম-আটকা লাগে না।

এই চত্বরের দেওয়ালগুলির উর্দ্ধভাগে বিশেষ নকশার টাইল বসানো রয়েছে, প্রত্যেক শ্রেণীর শেষে ঝুলে থাকা ‘ড্রিপ’ টাইলগুলির নকশাটা খুব অনন্য; বাদুড়ের আকারে তৈরী, বিশুদ্ধ মিং ডিজ়াইন, তাতে চৈনিক অক্ষর “শৌ” (দীর্ঘ জীবন) কে ঘিরে রেখেছে পাঁচটি বাদুর, যা হল পাঁচ আশীর্বাদের প্রতীক – দীর্ঘ জীবন, ধনদৌলত, স্বাস্থ্য, নৈতিক উৎকর্ষ, এবং স্বাভাবিক মৃত্যু।

Bat shaped Drip Tiles on Roof

পায়ে চলার পথ প্রায় পুরোটাই চীনদেশ থেকে আনা সুন্দর রঙীন পাথরকুচি দিয়ে মোজ়াইক কারুকার্য করা; এর পুরোটাই সুজৌ-এর কর্মকারদের হাতে বসিয়ে তৈরী। নকশার নাম হলো ‘ক্র্যাব্যাপ্‌ল ব্লসম্‌’ বা বন্য আপেল-এর প্রস্ফুটিত ফুল। এই অঞ্চলের দরজাগুলোও একই আকারের।

Crabapple mosaic and door

আপেল ফুলের দরজা অতিক্রম করে এগিয়ে গেলেই আসে জলের ওপরে দাঁড় করানো একটা মণ্ডপ বিশেষ, প্রবেশপথে তার দুটো সিংহ মূর্তি; এর নাম ‘মৎস্যজ্ঞানের মণ্ডপ’ বা ‘নোয়িং দ্য ফিশ প্যাভিলিয়ন’ – ধ্যান বা দার্শনিক তত্ত্বালোচনার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা।

Knowing the Fish pavilion

একটি প্রাচীন তাও গল্প অনুযায়ী, দুই বন্ধু জুয়াং জ়ী আর হুই জ়ী জলের ধার ঘেঁষে হাঁটছিল। জুয়াং জ়ী জলের মধ্যে মাছ খেলা করছে দেখে বলে, “দেখ, কি সুখী মাছগুলো!” হুই জ়ী বলে, “মাছের কিসে সুখ সেকথা তুমি জানবে কি করে? তুমি তো আর মাছ নও।” তার প্রত্যুত্তরে জুয়াং জ়ী বলে, “আমি মাছের সুখের কথা জানি কি না, সে কথা তুমি জানছ কি করে? তুমি তো আর আমি নও!” এই গল্পটি তাও দর্শনের বিশ্বাসব্যবস্থার পরিচায়ক, যে আমরা সকলেই প্রকৃতির অংশ, এবং তাই আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব উপায়ে প্রকৃতির সঙ্গে জন্মগত সম্পর্ক আছে।

Fish

মৎস্যজ্ঞানের মণ্ডপে দাঁড়িয়ে ‘দৃশ্যস্তর’-এর ধারণাটা খেয়াল করা যায়। এমনভাবেই জায়গাটির পরিকল্পনা করা, যে চারপাশের দৃশ্যাবলীর মধ্যে চৈনিক তাও দর্শনতত্ত্ব অনুযায়ী প্রকৃতিতে ‘য়িন’ এবং ‘য়াং’ শক্তিদ্বয়ের সমতার উদাহরণ বোঝানো যায়। যেমন, মণ্ডপের ছায়া, জলের আর্দ্রতা, এবং গাছের কোমল পাতা বা ফুল হোলো য়িন, এবং বিপরীতপক্ষে সাদা দেওয়ালের ওপর ঝকঝকে রোদ, মাটির শুষ্কতা, এবং পাথরের কাঠিন্য হল য়াং।

Composite Yin Yang

মৎস্যজ্ঞান লাভের ফলে ক্ষিদে পেয়ে যায়নি আশা করি। চলুন, এগিয়ে যাই। [তৃতীয় কিস্তি]

Advertisements

One thought on “লান সু ইউয়ান চৈনিক উদ্যান – দ্বিতীয় কিস্তি

  1. পিংব্যাকঃ লান সু ইউয়ান চৈনিক উদ্যান – তৃতীয় কিস্তি | haw-jaw-baw-raw-law, or হ-য-ব-র-ল

কেমন লাগল? লিখে ফেলুন!

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s