লান সু ইউয়ান চৈনিক উদ্যান – তৃতীয় কিস্তি

মৎস্যজ্ঞান লাভ শেষে চলুন এগিয়ে যাওয়া যাক। এখান থেকে বাঁদিকে বেঁকে পায়ে চলার পথ, ‘চতুষ্কোণ ক্র্যাব্যাপ্‌ল বাঁধুনি’র পাথরের রাস্তা, তার ওপর হেঁটে সুবিশাল বাঁশঝাড় অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হয়। দেওয়ালের পাশে রাখা দু’টো সরু পাথরের স্তম্ভ, তাদের নাম ‘মঞ্জরী প্রস্তর’ কারণ তাদের দেখতে বংশমঞ্জরীর মতন; চীনদেশের য়ুনান এবং জ়েজিয়াং অঞ্চল থেকে আমদানী করা ভিন্নভাবে ক্ষয়ীভূত পাললিক শিলা।

Square Crabapple - Shoot Rock

আরো এগিয়ে গেলেই একটা একতলা বাড়ি, তার নাম ‘স্বচ্ছ লহরীতে অনুচিন্তন’ বা ‘রিফ্লেকশন্স ইন ক্লীয়ার রিপ্‌ল্‌স’; এর ব্যবহার ঘরোয়া বৈঠক বা আড্ডার জন্য। পিছনের জানলা দিয়ে তাকালে বাইরে দৃশ্যাবলী জানলার ফ্রেম-এর মধ্যে ধরা পড়ে, পাথর, পাইন, বাঁশ, আবহাওয়া, সময় এবং ঋতুর সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্যপট বদলে বদলে যায়।

Reflexion in Clear Ripples

অনুচিন্তন শেষে এখান থেকে বেরিয়ে চলার পথ অনুসরণ করে এগোলেই সামনে পড়ে একটা বড় উঠান। ‘সুবাসের অঙ্গন’ বা ‘ফ্রেগ্‌রেন্স কোর্টইয়ার্ড’ হল অধ্যয়নকক্ষের পথে দু’টি উঠানের প্রথমটি। দু’টিতেই লাগানো থাকে নানারকম সুগন্ধী ফুলের গাছ (যেমন গন্ধরাজ, জুঁই, কিমোন্যান্থাস, হানিসাক্‌ল্‌, ফিলাডেলফাস, ইত্যাদি) যাতে সেই সৌরভ কাজের সময় শিল্পী বা বিদ্বান ব্যক্তির নাসিকাগোচর হয়। যেহেতু এরা বছরের বিভিন্ন সময়ে ফোটে, তাই সারা বছরই ভিন্ন ভিন্ন ধরণের গন্ধ পাওয়া যায়। সামনেই চন্দ্রদ্বার বা ‘মুন গেট’, যার ওপরে খোদাই করা আছে, “ভূমিচিত্র অধ্যয়ন কর”, আবার এর ঠিক অন্যপাশে লেখা আছে, “গন্ধগুলোকে শোন” – এর উদ্দেশ্য হল, ভ্রমণকারীকে মনে করিয়ে দেওয়া যে সুজৌ বাগানকে সম্পূর্ণ উপভোগ করতে হলে পঞ্চেন্দ্রিয়কে সজাগ থাকতে হবে। যেমন, ড্রিপ টাইলগুলো। ছাদ থেকে বৃষ্টির জল বয়ে যায় ঝুলন্ত ড্রিপ টাইল পর্যন্ত, তাদের গা বেয়ে ঝরে পড়ে পুঁতি-বসানো পর্দার মত বা ঝর্ণায়মান মুক্তোর মত। অনেক সময়, প্রশস্ত পাতাওয়ালা গাছ ঠিক এই টাইলগুলোর নিচে বসানো হয়, যাতে বৃষ্টির জল পড়লে বেশ শ্রুতিমধুর একটা শব্দসৃষ্টি হয়। চন্দ্রদ্বার পেরোলেই বিদ্বজ্জনের অঙ্গন।

Moon gate

এই দ্বিতীয় উঠানের বৈশিষ্ট্য হল প্রথমেই চোখে পড়ে দেওয়ালে ‘সছিদ্র বাতায়ন’ যা দিয়ে বাইরের দৃশ্যাবলী যেন ছিদ্রপথে ঢুকে পড়ে চক্ষুগোচর হবার জন্য। সর্বমোট ৫২টি এমন জানলা আছে পোর্টল্যাণ্ড-এর সুজৌ উদ্যানে। পায়ের নিচে এখানে যে মোজ়াইকের নকশা দেখা যাবে, তার নাম হল ‘চিড়-খাওয়া বরফের ওপর মুকুলিত বড়ই’ বা ‘প্লাম ব্লসম্‌স্‌ অন ক্র্যাক্‌ড আইস’; কাছাকাছি দু’টো বড়ই গাছ বাইরের দেওয়ালের ধারে লাগানো; শীতের শেষদিকে তাদের মুকুলগুলো উঠানে ঝরে পড়ে। যেহেতু বড়ই শীতের তোয়াক্কা না করেই ফুল দেয়, তাকে ন্যায়পরায়ণতা এবং শক্তির প্রতীক হিসেবে মানা হয়।

Scholars garden - Plum mosaic
ওপরঃ বাঁয়ে – বিদ্বজ্জনের অঙ্গন; ডাইনে – প্লাম মোজ়াইকের নকশা; নিচেঃ দেওয়ালের মধ্যে লীকি উইন্ডো, বা সছিদ্র বাতায়ন

এগোলেই পড়বে বিদ্বজ্জনের অধ্যয়নকক্ষ, যার কাব্যময় নাম ‘পরিব্যাপ্ত সুবাসের স্বর্গীয় দালান’ বা ‘সেলেশ্চিয়াল হল অফ পারমিয়েটিং ফ্রেগ্‌রেন্স’ – এটি বাড়ির মূল কক্ষ, তাতে দিবাশয্যা এবং বসার সরঞ্জামাদি রাখা রয়েছে; এখানে বসে হয়ত শিল্পী বা বিদ্বান ব্যক্তি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে দর্শন, অঙ্কন, কাব্য, বা মহার্ঘ কোন প্রাচীন বস্তু নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন হবেন। অথবা হয়ত ‘দ্বিপদী খেলা’-জাতীয় বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় নামবেন, যেখান একজন দু’লাইনের কবিতার প্রথম লাইনটি বলবেন এবং অন্যজনকে দ্বিতীয় লাইনটি তৈরী করে বলতে হবে। এর উদাহরণও আছে এই ঘরটিতে। দিবাশয্যার দু’পাশে চৈনিক ফার গাছের কাঠ দিয়ে নির্মিত দু’টো স্তম্ভ আছে, তাতে চৈনিক দ্বিপদী কবিতার এক একটা লাইন খোদাই করা আছে; একটি বলছে, “একাকী তরুবর পৃথিবীকে পথ দেখায় বসন্তবরণে” আর অন্যটিতে লেখা, “বরফের মধ্যেও দশ সহস্র ফুল সাহস করে ফুটে ওঠে” – ঈঙ্গিত ঘরের বাইরেই দাঁড় করানো বড়ই গাছগুলোর দিকে।

দরজা এবং জানলাগুলো চৈনিক নান কাঠের, এবং হাল্কা রঙের জটিল নকশার জাফরী এবং তাকগুলো গিংকো কাঠের। তাকগুলোতে সাধারণত সেই বাড়ির মালিকের সংগ্রহের কোন মহার্ঘ বস্তু রাখা থাকবে। মূল কক্ষের বাইরে একটা চিহ্নিত ছোট অঞ্চল ব্যবহৃত হবে লিপিবিদ্যা বা কাব্য-অঙ্কনাদি চর্চায়। এই অঞ্চলটার নাম, “সবুজের গুচ্ছে অর্ধ-বাতায়ন” বা “হাফ এ উইন্ডো ক্লাস্টার্ড ইন গ্রীন”।

Celestial hall
ওপরেঃ বাঁয়ে – জাফরীকাটা জানলার পাশে কবিতার স্তম্ভ; মধ্যে – ঘরের ভিতরের বিন্যাস; ডাইনে – মিং সাম্রাজ্যের সময়ের আসবাবপত্রের ইতিহাস; নিচেঃ বাঁয়ে – বিভিন্ন নকশার জাফরী; মধ্যে – বাহারে জানলা; ডাইনে – অর্ধ-বাতায়নের বিন্যাস

দেখা কিন্তু আরো বাকি আছে, সুতরাং চলুন যাই। [চতুর্থ কিস্তি]

Advertisements

One thought on “লান সু ইউয়ান চৈনিক উদ্যান – তৃতীয় কিস্তি

  1. পিংব্যাকঃ লান সু ইউয়ান চৈনিক উদ্যান – চতুর্থ কিস্তি | haw-jaw-baw-raw-law, or হ-য-ব-র-ল

কেমন লাগল? লিখে ফেলুন!

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s